যুদ্ধ নয় শান্তি চাই এমন প্রচারণা নিশ্চিত প্রতারণা!

me 2জুয়েল রাজঃ  ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সিরিয়ায় আইএস নিয়ন্ত্রিত এলাকায় হামলার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে থেকেই ব্রিটেনসহ সারা বিশ্ব এই আক্রমণের বিরোধিতা করছেন। যদিও শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্টে আক্রমণের পক্ষে ভোট বেশি পড়েছে এবং ব্রিটেন সিরিয়ায় তাদের বিমান হামলা চালনো শুরু করেছে। আর তখনই আমাদের মানবতাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
কঠিন হলেও সত্য সাম্প্রদায়িকতার বিষে আজ নীল পুরোবিশ্ব। প্যারিস হামলার পরপর শুধুমাত্র ব্রিটেনেই সাম্প্রদায়িক হামলা ৩ ভাগ বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছে লন্ডন মেট পুলিশ। নভেম্বরের শেষ এক সপ্তাহে ৭৬টি বিদ্বেষের ঘটনা ঘটেছে শুধুমাত্র লন্ডনে। লন্ডনের একটি মসজিদে আগুন দেয়ার চেষ্টার সময় একজনকে আটক করেছে পুলিশ হয়েছে, হিজাব পরার অপরাধে ট্রাম থেকে নামিয়ে দিয়েছে নিউ ক্যাসেলে, বার্মিংহ্যামে হিজাব পরার জন্য এক কিশোরীর মুখে ঘুষি মারা থেকে শুরু করে মুসলমান কিশোরীর উপর ছুরিকাঘাতের মতো ঘটনা ও ঘটেছে। এটা কি শুধু প্যারিস হামলাকে কেন্দ্র করে হচ্ছে? আমেরিকার ৯/১১ ব্রিটেনের ৭/৭ থেকে সর্বশেষ প্যারিসের ১৩/১১ হামলা সব কি ইহুদী নাসারাদের ইশারায় ঘটেছে? উপরোক্ত ঘটনাবলী ভীত করে তোলে। সামনে ভয়ঙ্কর সময় অপেক্ষা করছে ইউরোপের এশিয়ানদের জন্য। কারণ তখন মুসলমান বলতে তারা বাদামী চামড়ার সব মানুষকেই বুঝবে। অতএব, হিন্দু মুসলিম লিবারেল, মডারেট বা উগ্রমতবাদ কেউই আর নিরাপদ না। আঘাত আসবে সবার জন্য। ইতিমধ্যে ইউরোপের অবৈধ সকল পাকিস্তানিকে দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপ। আর সরাসরি বললে মুসলমানদের ফেরত পাঠাতে চাইছে তারা।
ব্রিটেনের তরুণ প্রজন্মের মধ্যেই প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে আইএস সমর্থক। ব্রিটেন যখন নিজের দেশে আইএস উৎপাদনের কারখানা বন্ধ না করে আইএস নির্মূলে যায় তখন ব্রিটেনের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাও স্বাভাবিক। ব্রিটেন পুলিশের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৭০০ তরুণ তরুণী আইএস যুদ্ধে শরিক হয়েছে। যাদের অনেকে আবার ব্রিটেনে ফিরেও এসেছে। সেবামূলক খাত থেকে সরকার গণহারে বাজেট কর্তন করছে সেই সময় কোটি টাকা মূল্যের বোমা আঘাত হানছে সিরিয়ায়। ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের কলঙ্ক চৌধুরী মঈনুদ্দিনে মত দণ্ডিত একজন যুদ্ধাপরাধীকে নিজের দেশে রেখে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস মোকাবেলা করছে ব্রিটেন সেটা কিছুটা হাস্যকরও বটে!
যুদ্ধ চাই না, রক্ত চাই না, শান্তির পৃথিবী চাই আমরা। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে বারবার রক্তাক্ত হয়েছে মানবতা। বেকুব কারা মধ্যপ্রাচ্য না ইহুদী নাসারারা! শুধুমাত্র সৌদি আরবের রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রেখে এই জঘন্য খেলাটা খেলছে তাঁরা। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে পৃথিবীর কোন প্রান্তেই কোন মানবতাবাদীই টু শব্দ করে নি। শুধুমাত্র সৌদি রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করায় চলতি মাসে ৫২ জনের শিরোচ্ছেদ করবে সৌদি আরব। তাবৎ পৃথিবীর মানবতা প্রেয়সীর আঁচলে মুখ গুঁজে চাঁদ তারা ফুল পাখির স্বপ্ন বুনছেন হয়তো। সাদা, কালো, হিন্দু মুসলিম, শিয়া, সুন্নী কোন মানুষের রক্তই আমাদের কাম্য নয়। এই যুদ্ধটা ধর্মের নয়। এই যুদ্ধটা সৌদি রিয়াল আর মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের যুদ্ধ। মাঝখান থেকে বলির পাঁঠা হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সেটা অবশ্যই কাম্য নয়। তবে পৃথিবী জুড়ে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে এর থেকে মুক্তি পেতে হলে এই যুদ্ধটা অনিবার্য হয়ে পড়েছে। আমার এই ব্যক্তিগত মতামতকে অনেকেই ভিন্ন চোখে বিচার করার অবকাশ আছে। কিন্তু সত্যটা তাই। সিন্দাবাদের ভূতের মতো চেপে থাকা আইএসকে যে কোন মূল্যে নিশ্চিহ্ন করা উচিৎ বলেই আমি বিশ্বাস করি।
গাজায় ইসরাইলের হামলা, আপনি আমি সবাই গিয়ে দাঁড়ালাম ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সামনে রাস্তায়। রোহিঙ্গারা সাগরে ভাসছে, হাজার হাজার সিরিয়ান ইউরোপের সীমান্তে ঝড় বৃষ্টি শীতে সীমান্ত পাড়ি দিতে অপেক্ষায় হাজার হাজার নারী শিশু, আমদের অন্তর হাহাকার করে উঠে, সাগর তীরে শিশু আয়লানের মৃতদেহ, কেঁদে উঠে বিশ্বমানবতা। আমরা রাস্তায় দাঁড়াই, প্রতিবাদ করি, আমাদের সহানুভূতি প্রকাশ করি, বিপন্ন মানুষের আশ্রয়ের জন্য দাবি জানাই । কিন্তু লাখ লাখ মানুষ যাদের জন্য বিপন্ন হচ্ছে তাঁদের নির্মূল করার দাবি তুলি না। আজকে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন সর্বশেষ জার্মান যখন আইএস দমনে একযোগে হামলা করছে তখন আমাদের ঘুম ভেঙেছে। যুদ্ধবিরোধী মিছিলে শ্লোগানে মুখরিত আজ সব।
বোকো হারাম বলেন, তালেবান বলেন, আর বর্তমান সময়ের আইএস বলেন, যখনি এদের তাণ্ডবের ঘটনা ঘটে, এরা সহি মুসলিম নয় বলেই আমরা দায়িত্ব পালন শেষ করি। হাজার হাজার শিয়া মরছে, সুন্নী মরছে আপনার আমার তাতে কিছু যায় আসেনা । মানবতা দিবা নিদ্রায় নাক ডাকে। একবার কি বলেছেন আইএস বোকো হারাম মানবতার দুশমন। এদের সমূলে উৎপাঠন করা দরকার। না সেই দাবি আমরা তুলিনি। এখন যখন ব্রিটেন ফ্রান্স আমেরিকা তাঁদের নিজেদের তৈরি করা দানব ধ্বংস করতে চাইছে আমাদের মায়া কান্না উতলে উঠছে। দুই দুইটা বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ব, লাভ ক্ষতির হিসাব আমরা জানি খুব ভাল করেই। পৃথিবী জুড়ে যা চলছে তা চোর পুলিশ খেলার মতোই, যুদ্ধ যুদ্ধ শান্তি শান্তি খেলা খেলছি আমরা প্রতিটা মানুষ। কঠিন সত্যটাকে কেউ মানতে চাইছি না। আইএস যদি সহি ইসলাম না হয়, মুসলমান না হয় তাহলে তাদের বিনাশে অন্তর কাঁদে কেন। মুক্তিযুদ্ধে আমরা ৩০ লাখ মানুষ হারিয়েছি। এই রক্তের জন্য কি তবে মুক্তিসংগ্রাম বাদ দিয়ে দেয়া উচিৎ ছিল। আইএসএর কারণে যারা নিজের জন্মমাটি ছেড়ে দেশান্তরী হয়েছে। মৃত্যুকে হাতের মুঠোতে নিয়ে অন্ধকার সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাঁরা মরার আগেই মরে আছে। নতুন করে মরার ভয় তাঁদের থাকার কথা না।
বিশ্ব রাজনীতি কিংবা ইহুদী নাসারা কাফেরদের ষড়যন্ত্র আমি খুবই কম বুঝি, আর সত্যি বললে সেই পরিমাণ জ্ঞানলব্ধও নই আমি। তাই সাদাসিধে ভাবে যা বুঝি তাই বলি। ধর্মীয় আধিপত্য বিস্তারের নামে যে রক্তপাত চলছে আমরা মনে মনে সেটাকে সমর্থন করছি। যদি খিলাফত প্রতিষ্ঠা হয় সেটা মেনে নিতেই প্রস্তুত হয়ে আছেন সবাই। তাই আগ বাড়িয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে চাইছেন না।
‘আপনা মাংসে হরিনা বৈরী’ বলে একটা প্রবাদ আছে। বলা হয় হরিণের নিজের মাংসই হরিণের শত্রু। তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের শত্রু তাঁদের তেলসম্পদ। ধর্মের মোড়কে মধ্যপ্রাচ্যে যত যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে সব কিছুর পিছনে জড়িত তেল সম্পদের মালিকানা অর্জন। সব জানার পরে, বোঝার পরে যারা খেলাফতের স্বপ্ন দেখেন অথবা ডলারের লোভে ধর্মকে রীতিমত ধর্ষণ করছে প্রতিনিয়ত সেই সব তথাকথিত জেহাদিদের জন্য মায়াকান্নার কোন কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।

মানবিক বিশ্বে সভ্যতার উৎকর্ষতার সময়েই যদি হিসাব করি, সাদ্দাম হোসেনের আমলে ১৯৭০ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত ৬ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৬৫-৬৬ সালে সুহার্তের সময়ে মারা গেছে ৫ লাখ মানুষ। ইরাক-ইরান যুদ্ধ, কুয়েত যুদ্ধ, আলজেরিয়া, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, লেবানন, ইথিওপিয়া, সিয়েরা লিওন থেকে বর্তমান সিরিয়া পর্যন্ত সেই হিসাব কোটি ছাড়িয়ে যাবে। ১৯৭১ সালে শুধুমাত্র বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে হত্যা করা হয়েছে ৩০ লাখ মানুষ।
যুদ্ধ চাই না, রক্ত চাই না, নিরপরাধ মানুষের হত্যা চাই না বলে আমরা যারা গলা ফাটাচ্ছি তাঁদের কাছে বিনীত নিবেদন একবার নিজের বুকে হাত দিয়ে প্রশ্ন রাখুন, কোনটা চাই, খেলাফত নাকি মানবিক বিশ্ব? অন্তরে সাম্প্রদায়িকতার বিষ পুষে রেখে শান্তির বাণী প্রচার প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, প্রতিটা মানুষ জন্মগত ভাবে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক। খুব কম মানুষই এর থেকে ব্যতিক্রম হতে পারে। মুখোশের আড়ালে নিজ নিজ ধর্মের অগ্রযাত্রাই সবাই কামনা করেন। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা থেকে বের হয়ে এসে মানবিক পৃথিবীর স্বপ্নই বাঁচিয়ে রাখতে পারবে এই পৃথিবীকে।

Share This Post

Post Comment