সংখ্যালঘু : আহমেদ শাহাব এর গল্প -পর্ব-০১

আহমেদ শাহাব
আহমেদ শাহাব
শ্যামাপদ বাবু আমার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। মাঝ বয়সী এবং সজ্জন। শেষোক্ত গুণটির কারণে তিনি কারো কারো কাছে বেশ অপ্রিয়ভাজনও। চারটি নগদ মাল ছাড়লে যে সর্পিল পথটি একেবারে বিশ্ব রোডের মত বাঁকহীন মসৃন আর প্রশস্থ হয়ে যায় শ্যামাপদ বাবুর কারণে তা আর হয়ে ওঠেনা। এজন্য সহকর্মীদের কাছে তিনি কিঞ্চিত ছিটগ্রস্থ বলে বিবেচিত। সহকর্মীরা বিষয়বুদ্ধিসম্পন্ন চালাক চতুর এবং সর্বোপরি যুগের মানুষ সুতরাং তাদের বিবেচনাটি ফেলনা নয়। অতএব শ্যামাপদ বাবু পাগল তকমাটি নামাবলীর মত গায়ে চাপিয়েই দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। এবং করছেন বেশ নিষ্টার সাথেই। কোনো বাদ অপবাদের তোয়াক্কা তিনি করেননা। অবশ্য সহকারী সহকর্মীদের যত আলোচনা সমালোচনা সব কিছু হয় শ্যামাপদ বাবুর অসাক্ষাতেই। তার সামনে সবাই আলিফের মতোই সোজা হয়ে থাকে। তিনি কথা বলেন কম। হাসেন তারচেয়েও কম। অবশ্য যখন হাসেন তখন একেবারে প্রাণ খুলে হাসেন।
হাসির শব্দ শুনে সহকর্মীরা মন্তব্য করে ’গোমরা মূখে গ্রেনেড ফুটেছে, আজ দিনটি বোধহয় ভালোই যাবে।
কিন্তু আর কেউ না জানুক আমি অন্ততঃ জানি শ্যামাপদ বাবুর ঐ প্রাণখোলা হাসির উলটো পিঠেই একটি চন্দ্র বিন্দু আছে এবং সেটাকে করুণ বলাটাই অধিক সঙ্গত। শ্যামাপদ বাবু এক সময় বাম রাজনীতির খুব নিষ্টাবান কর্মী ছিলেন। শ্রমজীবী আর সর্বহারার দুঃখ মোচনে এক সময় এতই মোহগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন যে নিজের জীবনের অমূল্য সময়টা তখন সংসারের এক বাতিল তৈজষের মতোই অবহেলিত হয়ে এক কোনে পড়ে রয়েছিল। মোহ যখন টুটলো তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সূর্যটা মধ্যাকাশ পেড়িয়ে পশ্চিমে হেলে পড়েছে। মেঘে মেঘে কেটে গেছে অনেক বেলা। তবু তিনি দমলেননা। ভাবলেন যা গেছে, গেছে। যা বাকি আছে তাকে অন্তত কাজে লাগানো প্রয়োজন। ফুল ফুটিয়ে ফলে পরিনত করাই জীবনের ধর্ম। এ প্রক্রিয়াতেই পৃথিবীতে জীবনের চাকাটি সচল রয়েছে। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের জীবনে ফুল ফুটাতে গিয়ে তিনি নিজের জীবনটাকে মরুতে পরিণত করেছিলেন। তাই মোহ ছুটা মাত্র তিনি অসময়ে ফুল ফুটানোর জন্য অসম্ভব ব্যস্থ হয়ে পড়লেন।
অনেক খোঁজাখোঁজির পর পাত্রীও একটা পেয়ে গেলেন। নীলা দত্ত তার মতো আইবুড়ো না হলেও মোটামেটি বয়স্ক বলা যায়। তিনিও অভিভাবকহীন মধ্যবিত্ত সংসারে বেশ কিছু পোষ্যকে লাইনে তুলতে গিয়ে নিজের অজান্তেই জীবনের লাইন থেকে ছিটকে পড়েছিলেন। তবু একটি সুপ্ত অংকুর যা মনের কোনে সংকোচিত হয়ে রয়েছিল শ্যামাপদবাবুর কল্যাণে তা হঠাৎ করেই লকলক করে উঠলো। তিনি সাগ্রহে রাজি হয়ে গেলেন। হাইস্কুলে শিক্ষকতার পেশাটিকে তিনি ছাড়লেননা। যদিও স্কুলটা বেশ দুরে অবস্থিত আর তাতে যেতেও হয় ভয়ানক ঝক্কি ঝামেলা করে। হোক তবু বহুদিনের সঙ্গী এ চাকুরীটা। স্কুলটাই তার এক রকমের ঘর সংসার হয়ে গেছে। শ্যামাপদবাবুও এ ব্যাপারে তাকে কোনো রকম চাপ দেননি। বলেছিলেন ’ চাকরীর ব্যাপারটা তোমার একান্ত করলেও আমার আপত্তি নেই ছাড়লেও না। নীলা বৌদিকে নিয়ে শ্যামাপদ বাবুর নতুন জীবন আনন্দে হেসে ওঠে। নীলা বৌদিও খুব বুদ্ধিমতি মহিলা। তিনি তার সমস্ত আবেগ অনুভুতি দিয়ে শ্যামাপদ বাবুর শূন্য আর নিরানন্দ সংসারকে ভরে তুলতে চাইলেন। কিন্তু এতসবের পরেও একটি শূন্যতা থেকেই গেল। আর সেই শূন্যতাই তাদের ছোট্ট সংসারে ধীরে ধীরে তার ছায়া বিস্তার করতে শুরু করলো। নীলা বৌদির বুকের ভেতরে সে শূন্যতা হাহাকার করলেও শ্যামাপদ বাবু মনে কষ্ট পাবেন এ ভেবে কোনোদিনও তা প্রকাশ করেননি। কিন্তু শ্যামাপদ বাবু নিজে থেকেই খুব ব্যস্থ হয়ে উঠলেন। তিনি নীলা বৌদিকে নিয়ে শহরের নামকরা ডাক্তারদের কাছে ছুটতে শুরু করলেন। ডাক্তারী পরীক্ষা নিরীক্ষায় যখন পরিষ্কার হয়ে গেল তাদের দুজনের কারোরই কোনো শারিরীক ত্রুটি নেই তার ছুটাছুটির মাত্রা আরো বেড়ে গেল। তার কেন জানি মনে হল বেলা আর বেশী বাকি নেই। যা করার তাকে এ বেলাই করতে হবে। কিন্তু তার সকল চেষ্টাই ধীরে ধীরে নিষ্ফল হয়ে যেতে থাকে। শ্যামাপদ বাবু আরো বিষণ্ণ হন। তার কথা আরো কমে যায়। হাসি বিরল হয়ে পড়ে। কাজের প্রতি মনযোগ শীতিল হয়ে যায়। আমি শ্যামাপদ বাবুর কষ্ট পড়তে পারি। আমি তার এই হতাশ আর ব্যর্থ চেহারা দেখে নিজেও খুব কষ্ট পাই। নিজে উপযাচক হয়ে তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারে আলাপ করাটাকেও আমার কাছে অশোভন মনে হয়। কিন্তু আমি দিব্যি বুঝতে পারি শ্যামাপদ বাবু তার মনের পাথরটাকে নামাবার জন্য বড় আইটাই করছেন কিন্তু তার অনড় অনত ব্যক্তিত্ব তাতে বাঁধ সাধে। যদিও ব্যক্তিগত ভাবে আমি শ্যামাপদ বাবুর সবচেয়ে প্রিয় ভাজন। পারিবারিক দিক দিয়েও আমাদের যোগাযোগটি খুব নিবিড়। তিনি যখন ছুটিতে থাকেন তখন আমার উপর দায় দায়িত্ব চাপিয়ে পরম নিশ্চিন্তে ছুটি ভোগ করেন। তিনি যখন তার মানসিক দ্বন্ধে ক্ষত বিক্ষত হয়ে কাজের প্রতি মনযোগ হারিয়ে ফেলছেন আমাকেই তখন নেপথ্য থেকে হাল ধরে রাখতে হয়েছে। তার মানসিক দ্বন্দের ব্যাপারটি আমি কাউকে বুঝতে দিইনা।
একদিন শ্যামাপদ বাবু আমাকে তার অফিস কক্ষে ডেকে পাঠান। আমি রুমে ঢুকে তার মূখের দিকে তাকাতে পারিনা। তিনিও না। তার পাহাড়ের মতো ব্যক্তিত্বে বড় একটা ফাটল আমি লক্ষ্য করি। তার মূখ অবনত। একটি ফাইলের উপর চোখ দু’টি স্থির। কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয় তিনি ফাইল দেখছেননা।
সফিক সাব, আগামী দুদিন আমি অফিস আসবনা। তিনি ফাইলের উপর চোখ রেখেই বলেন।
আপনি কোনো চিন্তা করবেননা স্যার। আমি সব ম্যানেজ করে নেব। আমি তাকে অভয় দানের মতো বলি।
আমি নীলাকে নিয়ে কাল সিলেট যাব। তিনি একটু দম নিয়ে বলেন।
সেই ভাল স্যার। বৌদিকে নিয়ে একটু বেড়িয়ে আসুন। সিলেট শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি দৃশ্য বৌদির ভাল লাগবে।
তিনি আর কথা বলেননা। আমি বেড়িয়ে যেতে উদ্যত হই। শ্যামাপদ বাবু মূখ তুলেন।
সফিক সাব আমি আসলে কোনো অবকাশে যাচ্ছিনা।
আমি দাঁড়িয়ে পড়ি।
নীলার বহুদিনের ইচ্ছে একবার শাহজালালের মাজারে যাবে। ওর একটা মানত না কী যেন আছে।
ছোট্ট এ কথাটি বলতে তাকে মনের সাথে কতটুকু যুদ্ধ করতে হয়েছে আমি তার মূখ না দেখেও বুঝতে পারি। আমাদের দেশের পঁচে যাওয়া সুবিধাবাদী বামপন্থীদের মতো তিনি নন, যারা জীবনের একটি বড় অধ্যায় মেহনতি মানুষের রাজত্ব
কায়েমের স্বপ্ন এবং সংগ্রামে লিপ্ত থেকে পড়ন্ত বেলায় নিজেই ক্ষমতার দিকে ছুটে যেতে যেতে ডান থেকে আরো অধিক ডান হয়ে উঠেছেন। শ্যামাপদ বাবু সতীর্তদের এই স্খলনে কষ্ট পান। বলেন ’ওরা নষ্ট ফল। ওরা সমাজের পরিবেশকে মারাত্মক ভাবে কলুষিত করছে। শ্যামাপদ বাবু এখনও স্বপ্ন দেখেন ভোলগার বিস্তৃত তীর ধরে সমাজতন্ত্রের যে সূর্য অস্থ গেছে সে সূর্য আবারো উঠবে। আত্মগত ভুলভ্রান্তিকে সংশোধন করে নতুন রূপে নতুন আঙ্গিকে আবার ফিরে আসবে। ফিরে আসতেই হবে। পৃথিবীতে এক তরফা শোষন আর পূঁজিবাদের শাসন চলতে পারেনা। সেই অসম্ভব শক্ত আর স্বপ্নবিলাসী মানুষটিই যখন একটি সন্তানের আশায় মাজারে মানত দিতে যান তখন বুঝতে বেগ পেতে হয়না বুকের স্বপ্নটি কত আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। মানুষ ডুবে যাবার আগে সামান্য খড়কুটুটাকেও আকড়ে ধরে বাঁচতে চায়।
আমি কোনো রকমে বলি ’যান স্যার, বৌদির মানতটাকে পূরণ করে আসুন। অনেকেতো এসব মানত টানত করেও ফল পায় শুনেছি।
তিনি ম্লান মূখে হাসলেন।
দিন যায়। শ্যামাপদ বাবু আরো বেশী বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হন। অফিসে আরো বেশী অমনোযোগী হয়ে উঠেন। আস্থে আস্থে আমি নিজেরই অজান্তে অফিসে শ্যামাপদ বাবুর আসনটিতে প্রায় স্থায়ী হয়ে পড়ি। নিজেরই অজান্তে। সহকর্মীরা আমাকে তা স্মরন করিয়ে দেয়। আমি চমকে উঠি। তাইতো। এমনতো চলতে পারেনা। শ্যামাপদবাবু যে রকম চন্দ্রনাথ, বায়েজিদ বোস্তামী, কল্লাশহীদ, পণাতীর্থ, নাঙ্গলকোট আর মুড়ারবন্দী হয়ে উঠেছেন তাতে তার মানসিক সুস্থতা নিয়েই অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারে। অফিসেতো তার নিন্দুকের সংখ্যাটাই বেশী। আমি শ্যামাপদ বাবুকে কথাটি বলতে পারিনা। শত হলেও তিনি আমার বস। আমার শ্রদ্ধাভাজনতো বটেই।
আমি একদিন নীলা বৌদিকেই কথাটা বলি।
বৌদি বলেন ‘সফিক ভাই, আমিতো ওকে এ ব্যাপারে অনেক বুঝিয়েছি। এ পৃথিবীতে নিঃসন্তান দম্পতি কি শুধু আমরাই ? অন্যরা যদি সন্তান ছাড়াই চলতে পারে আমরা কেন পারবনা। আমি পত্রপত্রিকা ঘেঁটে দেশের অবাধ্য সন্তানদের কীর্তিকলাপ তার সামনে তুলে ধরে বলি আমাদের সন্তান হলে যে এরকমটি হবেনা তার গ্যারান্টি কি কেউ দিতে পারবে। কেন এত উতলা হয়ে উঠছ। তাছাড়া আমাদের সময়টাতো আর সহসা চলে যাচ্ছেনা। আরো পথ বাকি আছে। দেখনা কী হয়। কিন্তু আমার কথাতো ও শুনতেই চায়না। আমি বলি ‘ বৌদি, একদিন যারা দুর থেকে কানাঘুষা করতো আজ তারা প্রায় প্রকাশ্যেই স্যারের বিরুদ্ধে কথা বলছে। আমি কোনো রকম সামাল দিয়ে রেখেছি। কিন্তু এরকমতো বেশী দিন ধরে রাখা যাবেনা বৌদি। সুযোগ সন্ধানী আর দুশ্চরিত্র গুলো মুখিয়ে আছেযে।

Share This Post

Post Comment