বাংলাদেশে কোন রাজাকার নাই!

me 2জুয়েল রাজঃ এই লেখাটি যখন লেখছি বাংলাদেশে তখন আলবদর বাহিনীর প্রধান আলী আহসান মুজাহিদ ও আরেক খুনী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসী কার্যকর করা হয়ে গেছে। সারা বাংলাদেশ তথা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাঙালি জেগে ছিলেন ইতিহাসের দায়মুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণের।

কোন মানুষের ফাঁসির রায়ে অন্য মানুষ আনন্দিত হবার কথা না , তবু রাত জেগে মানুষ আনন্দ করছে , মিষ্টিমুখ করছে। কতোটা ঘৃণা বুকে জমা থাকলে এমন হতে পারে, সেটা কিছুটা হলে ও ধারণা করতে পারি।

আলী আহসান মুজাহিদ যখন ২০০১ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা গাড়িতে উড়িয়ে রক্তে ভেজা বাংলার মাটি দাপিয়ে বেড়িয়েছে। আলী আহসান মুজাহিদ মন্ত্রী থাকা অবস্থায় ৬৯এর অভ্যুথানের নায়ক তোফায়েল আহমেদকে বন্দী অবস্থায় হাতে হাতকড়া পরা অবস্থায় কোথা থেকে যেন ঢাকা নিয়ে আসা হচ্ছিল, মাওয়া ফেরীতে তোফায়েল আহামেদকে বহনকারী পুলিশ ভ্যান ও মুজাহিদের পতাকাবাহী গাড়ি একই সাথে উঠেছিল । তোফায়েল আহামেদ এই ঘটনাটি সংসদেও বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধ্বের নায়কের হাতে হাতকড়া আর মুক্তিযুদ্ধের ভিলেনের গাড়িতে পতাকা।

২০০৭ সালে নির্বাচন কমিশনের সামনে, আলী আহসান মুজাহিদ দম্ভভরে গণমাধ্যমকে বলেছিল ‘বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধী নাই , এটা তাদের কল্পনা প্রসূত , নিজেদের বানোয়াট একটা উদ্ভট চিন্তা , স্বাধীনতা বিরোধী নাই , তখন থেকেই নাই , এখনো নাই । স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ছিলোও না এখনো নাই’’ প্রচারিত হয়েছে।

এমনকি মানবতা বিরোধী অপরাধে তার বিচার চলাকালীন সময়ে সাকা চৌধুরীর দম্ভ মহান জাতীয় সংসদ সহ গণমাধ্যমে বহুবার অশ্লীল বক্তব্য ও জাতিকে শুনতে হয়েছে যা সংবাদমাধ্যমে প্রচার অনুপযোগী।তাদের ফাঁসির মাধ্যমে কলঙ্কমুক্তির একটা দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে বাঙালি জাতির। আসলেই কি দায়মুক্তি ঘটছে?

একটা ভয় থেকে যাচ্ছে , রাজাকারদের যাদের ফাঁসি হয়েছে বা আগামীতে হবে, তাদের সন্তানদের যে আস্ফালন গণ মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে আতংকিত না হয়ে পারা যায় না। সাকা চৌধুরীর মেয়ের একটা সাক্ষাতকার দেখলাম যেখানে সে বলেছে ‘শেখ হাসিনা যদি ৪০ বছর পর তাঁর বাবার হত্যার বিচার করতে পারে তাহলে আমার বাবার হত্যার বিচার ও একদিন হবে’!

সাকা চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে মিডিয়াতে যেভাবে কাভারেজ দেয়া হয়েছে মনে হয়েছে পাকিস্তানী সিনেমার কোন নায়ক! বঙ্গভবন থেকে তার গ্রামের বাড়ির বসার ঘর পর্যন্ত গণমাধ্যম তার পিছেপিছে ছুটে গেছে। সাকা থেকে এককাঠি এগিয়ে গিয়ে তার ছেলে ভিলেনসুলভ হাঁসিতে যেভাবে বলেছে তার ৬ ফুট ২ ইঞ্চি বাবা প্রাণভিক্ষা চাইতে পারেন না। তার বাবা অপরাধ করেছিলেন কিনা সেটা একবার ও বলে নাই সে।

ইতিহাস ফিরে আসে আপন কক্ষপথে। একাত্তরে কতো পিতা তার সন্তান বাঁচাতে, কতো সন্তান তার পিতাকে বাঁচাতে সাকা, মুজাহিদের কাছে মিনতি করেছে কে জানে? সাকার ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতির কাছে তার পিতার প্রাণভিক্ষার সুপারিশ করতে। যদিও পরে তারা বলেছে সালাউদ্দিন কাদের প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন নি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ১৯৭৫ থেকে বারবার যেভাবে বিতর্কিত করেছে, বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার বিষয়টিকে মানুষের কাছে মিথ্যাভাবে প্রচার চালিয়েছিল। ঠিক একইভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করতে বিচার শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশে বিদেশে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে আসছে। একই প্রক্রিয়ায় সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের প্রাণভিক্ষার বিষয়টিকে বিতর্কিত করে তুলেছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনটিকেও বিতির্কিত করতে উঠেপড়ে লেগছে।

সালাউদ্দিন ও মুজাহিদের প্রাণভিক্ষার আবেদনটি সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হওয়া উচিৎ বলেই আমি মনে করি। আইনীভাবে বাধ্যবাধ্যকতা আছে কিনা আমার জানা নেই। প্রাণভিক্ষার বিষয়টি নিয়ে কোন ধরনের বিতর্ক জন্ম দেয়ার আগেই এর স্থায়ী সমাধান হওয়া উচিৎ। সাকা চৌধুরীর ছেলেমেয়ের দম্ভভরা ক্রুর হাসি আমদের ভাবিত করে।

বিবিসি সহ বাংলা বিভিন্ন অনলাইন সংবাদপত্রের পাঠকের মন্তব্যসমূহ আতঙ্কিত করে তুলে। আমরা এই মন্তব্যকারী প্রজন্মের সাথে বাংলাদেশে বসবাস করছি। যারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে সাকা ও মুজাহিদ নিস্পাপ। এরা একাত্তরে কোন অপরাধ করেনি। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক স্বার্থে ইসলামী নেতাদের অবিচার করে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। এরা অনেকেই পড়ালেখা চাকরী-বাকরী করা মানুষ। এই মানুষগুলোর মগজ আত্মা সব পচে গেছে। এই মগজ পচা প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশ কতটা নিরাপদ? যারা এখনো অন্তরে লালন করে পাকিস্তানি আমরা মুসলমান ভাই-ভাই!

রাজাকারদের জানাজার নামাজে ফটোশপ করে লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করতে চাইছে। ইনকিলাব সংবাদ শিরোনাম করেছে সাকা ও মুজাহিদের ফাসির রায়ে হিন্দুপাড়ায় উল্লাস, মিষ্টি বিতরণ।

বাংলাদেশের দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসির দণ্ডকে ‘পাকিস্তানের সমর্থকের’ বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের সমর্থক’ কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ বন্ধ করার এটাই উপযুক্ত সময়।

একই আচরণ লক্ষ্য করা গেছে কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করার পর।পাকিস্তানী দায়িত্বশীলদের বক্তব্য ইনকিলাব পত্রিকার শিরোনাম কিংবা ফটোশপকারীদের কাজগুলো একসাথে মিলে যায়। জামায়াত-বিএনপির অনুসারী যারা অনেককেই দেখলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আহাজারী করছেন। সেই আহাজারী আতংকিত হওয়ার মতো। রাজাকার আলবদরদের ফাঁসি কার্যকর করা হলেই কি পুতঃপবিত্র হয়ে যাবে বাংলাদেশ? এই আহাজারী প্রজন্মকে সাথে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে? মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশ কি এদের সাথে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে?

কামারুজ্জামানের মৃত্যু পরবর্তী মানবকন্ঠ পত্রিকায় আমার একটি লেখায় উল্লেখ করেছিলাম,’’ অপরাধীর বীরের বেশে বিদায়, দৈনতা মিডিয়ার নাকি চিন্তার’’ সেই অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি। যুদ্ধাপরাধী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মিথ্যাচার করার, বিচার প্রক্রিয়া কিংবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার সুযোগ করে দিচ্ছে আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো। নিরপেক্ষ হওয়ার অজুহাতে বাংলাদেশের সাথে এটা এক ধরনের প্রতারণার শামিল।

মানবতাবিরোধী অপরাধে আটকদের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ,যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা আবদুস সুবহান, এ টি এম আজহারুল ইসলাম, মীর কাসেম আলী ছাড়াও সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার, মোবারক হোসেন, আবদুল জব্বার, মাহিদুর রহমান, ফোরকান মল্লিক, খান মোহাম্মদ আকরাম হোসেন ও সিরাজ মাস্টারের আপিল বিচারাধীন এর মধ্যে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর আপিলের শুনানি চলছে।

সাঈদীর মামলায় রিভিউ নিষ্পত্তি হয়নি এখনো। আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগ করছে সাঈদী । জামায়াতের সাবেক সদস্য আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, আল-বদর বাহিনীর নেতা চৌধুরী মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান, ফরিদপুরের নগরকান্দার বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন এবং কিশোরগঞ্জের রাজাকার সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান আলীম মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী হিসাবে পলাতক।

এই আসামিদের ফাঁসির মধ্যদিয়ে কি বাংলাদেশের কলংকতিলক মুছে যাবে, জাতির দায়মুক্তি ঘটবে। হাজার হাজার উত্তরসূরী রেখে যাচ্ছে রাজাকার ও তাদের বংশধরেরা । প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এরা বিষিয়ে তুলবে বাংলাদেশকে তাদের ভাষ্যমতে যা বুঝা যায় বাংলাদেশে কোন রাজাকার নাই, কোন যুদ্ধাপরাধী নাই, ছিলো না কোনকালে । সব সাজানো নাটক। এই যে নতুন প্রজন্মের রাজাকার সৃষ্টি হচ্ছে তা দেখে মনে হচ্ছে বাংলাদেশে কোন রাজাকার নাই এই কথাটা আমরা আর কোনদিন বলতে পারবনা। সেই দিন বাংলাদেশে আর আসবে না। না হয় তাদের মতো আমাদের বিশ্বাস করতে হবে “বাংলাদেশে কোন রাজাকার নাই’’

সমস্ত মিথ্যাচার রুখতে, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস বাঁচিয়ে রাখতে হলোকাস্ট আইনের মতো আইন বাংলাদেশে এখন সময়ের দাবী। মিডিয়াতে যাতে নিরপেক্ষতার নামে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক আদলাত এর ট্রাইবুনাল নিয়ে কোন প্রশ্ন না তুলতে পারে , এই বিষয়গুলো সংরক্ষণ করতে হবে। ৭১ এর রাজাকার, আলবদর, আলশামস, ৭৫ এর খুনী চক্র, ১৯৮১ সাল থেকে শেখ হাসিনা কে হত্যাচেষ্টার সবাই এক ছাতার নীচে সমবেত এখন।

মনে রাখতে হবে খুনিরা যুগে যুগে এক জায়গায় এসে মিলে যায়!

Share This Post

Post Comment