অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য- এক বিস্মৃত শহীদ বুদ্ধিজীবী : উজ্জ্বল দাশ

শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য
শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য
২৬শে মার্চ ১৯৭১। ভোর রাতে পাকিস্থানী সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ হল মাঠে ধরে এনে গুলি করে হত্যা করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকসহ অসংখ্য মানুষকে। আততায়ীদের হাতে নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সম্ভাবনাময় তরুণ শিক্ষক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য। পাকিস্থানী বাহিনী হলের প্রতিটি রুম খুঁজে দেখছিল কেউ জীবিত পরে আছে কিনা। অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকে কিভাবে হত্যা করেছিল তা স্বচক্ষে দেখেছিলেন জগন্নাথ হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক পরিমল গুহ, শোভা পাল ও বই বিক্রেতা ইদু মিয়া। অনুদ্বৈপায়ন তখন হল সংসদের রুমে (এসেম্বলী হল) থাকতেন। তাঁকে ধরে নিয়ে হাত দুটি পেছনে মোড়া করে বেঁধে উবু করে বসিয়ে রেখেছিল। সারা শরীরে রাইফেলের বাট ও বুট দিয়ে আঘাত করে তার বোধশক্তি রহিত করে দিয়েছিল। একটা সময় পরনে ছিল তার শুধু একটি অর্ন্তবাস। বিড় বিড় করে তিনি ঠিক কি বলছিলেন তা বুঝা যাচ্ছিল না। যত চিৎকার করছিলেন নরপশুদের অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অনুদ্বৈপায়ন যখন প্রায় আধমরা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

জগন্নাথ হলের আবাসিক শিক্ষক গোপাল কৃষ্ণনাথ তার বাসার জানালা দিয়ে হত্যাকান্ড দেখেছিলেন। তিনি দেখেন, হানাদার বাহিনী বিকেলে বুলডোজার দিয়ে গর্ত খুঁড়ে প্রখ্যাত দার্শনিক ড: গোবিন্দ চন্দ্র দেব (জি.সি) ও অনুদ্বৈপায়নসহ অসংখ্য ছাত্র ও কর্মচারীদের মৃতদেহ মাটিতে চাপা দিয়ে রেখে যায়। শহীদ অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার জন্তরী গ্রামের সন্তান। ১৯৪৫ সালের ৩১শে জানুয়ারি এক সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম করেন। পিতা দিগেন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন নামকরা আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। নবীগঞ্জ যোগল কিশোর (জে.কে) হাই স্কুলের কৃতি ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম অনুদ্বৈপায়ন। ১৯৬১ সালে স্কুল থেকে প্রথম শ্রেণীতে অংক ও সংস্কৃত বিষয় দুটিতে লেটার নম্বর পেয়ে ম্যাট্রিকুলেশন (এস.এস.সি) উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৩ সালে এম.সি. কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে মেধা তালিকায় একাদশ স্থান অধিকার করে আই.এস.সি (উচ্চ মাধ্যমিক) পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হন।

১৯৬৬ সালে অনুদ্বৈপায়ন পদার্থবিদ্যায় প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় স্থান অধিকারে বি.এস.সি সম্মান ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ফলিত পদার্থ বিদ্যায় প্রথম শ্রেনীতে দ্বিতীয় স্থান পেয়ে এম.এস.সি. পাশ করেন। অনুদ্বৈপায়ন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নব প্রতিষ্ঠিত ফলিত পদার্থ বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র। ১৯৬৮ সালের ১৪ই মার্চ ফলিত পদার্থ বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন অনুদ্বৈপায়ন আর একই বছরের ১লা জুলাই জগন্নাথ হলের সহকারী আবাসিক শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি পান। শহীদ অনুদ্বৈপায়ন শিক্ষকতাকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ছাত্র হিসেবে যেমন মেধাবী, শিক্ষক হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। অনুদ্বৈপায়ন গবেষক হিসেবে পরিণত হতেন এতে কোন সন্দেহ ছিলনা এমনটাই আশাবাদ ছিল তাঁর সহকর্মী শিক্ষকদের। কলম্বো প্লানের বৃত্তি নিয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য তার যাবার সব ব্যবস্থা চুড়ান্ত ছিল। ২৬শে মার্চ রাতে তার লন্ডনের উদ্দেশ্যে বিমানে উঠার কথা। ভোর রাতেই নিভে গেল অনুদ্বৈপায়নের জীবন প্রদীপ।

স্কুল ও কলেজ জীবনে তিনি অনেকটাই রক্ষণশীল ছিলেন বলেই জানা যায় তাঁর বন্ধুদের কাছ থেকে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সকলের নিকট উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

তাঁর সহপাঠী নবীগ্ঞ্জ জে.কে.হাই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দিন আহমেদ বন্ধু অনুদ্বৈপায়নের পরিবর্তন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ’ অনুদ্বৈপায়ন আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলো। কথাপ্রসঙ্গে বলল, কিরে মাংস খাওয়াতে পারবি, তোরা মাংস খুব ভাল রাঁধতে পারিস! তাকে বলি, তুইনা কারো বাড়িতে জলই গ্রহণ করতি না, আর এখন বলছিস মাংস খাবি। প্রত্যুত্তরে অনুদ্বৈপায়ন বলেছিল, বন্ধু, ’আগে ছিলাম ব্রাহ্মণ, এখন হয়েছি মানুষ।’

পাকবাহিনী সেই মানুষ হয়ে উঠা অনুদ্বৈপায়নকে হত্যা করল। অনুদ্বৈপায়নের সহকর্মীদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ২৫শে মার্চ তিনি ঢাকায় ফিরে সন্ধ্যা বেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে গিয়েছিলেন বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করে বিদায় নিতে। কেউ কি জানত এটাই হবে তার শেষ বিদায়। রাত ৯.৩০ টায় যখন তিনি ক্লাব থেকে ফিরে তার শিক্ষক জনাব প্রফেসর জালালুর রহমানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জগন্নাথ হলের দিকে যাচ্ছিলেন তখন নাকি বলেছিলেন, হলে যেতে তার কেমন যেন ভয় করছে। প্রফেসর জালালুর রহমান তাঁর স্মৃতি সভায় দেয়া বক্তব্যে অনুতাপ করে বলেছিলেন, তিনি যদি ঐ রাতে তাকে জোর করে তার বাসায় নিয়ে যেতেন তার জীবনের এ পরিণতি হয়ত ঘটত না। অনুদ্বৈপায়নের শহীদ হওয়ার খবর খোদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথমে আমলে নেয়ার পরিবর্তে তাঁকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কাজে যোগদান না করায় নোটিশ দিয়েছিল। ৩১-৮-১৯৭১ তারিখে তৎকালীন রেজিস্টারের দেয়া এক নোটে দেখা যায় ফলিত পদার্থবিদ্যার প্রভাষক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য আরও কয়েকজন বরেণ্য শিক্ষকদের সাথে ২৫শে মার্চের কালোরাতেই যে নিহত হয়েছেন এ নির্মম সত্যটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অগোচরে ছিল। আসলে জেনে শুনেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ভন্ডামীর আশ্রয় গ্রহণ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার তার ৪-৯-১৯৭১ তারিখের এক চিঠিতে অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের গ্রামের বাড়ীর ঠিকানায় তাকে বরখাস্তের নোটিশ দেন। অথচ তিনি তখন জগন্নাথহলের গণকবরে সমাহিত। বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর এস.এম. ফজলুর রহমান তার ১৬-১০-১৯৭১ তারিখের এক চিঠিতে উপাচার্যকে জানান যে, সহকর্মী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য মুক্তিযুদ্ধের প্রথম রাতেই নিহত হন। বিভাগীয় প্রধানের এই চিঠিটি বলা যায় একটি ব্যতিক্রম যাতে বিলম্বে হলেও বলা হয়েছে তার প্রিয় ছাত্র সহকর্মী নিহত হয়েছেন।

১৯৭২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি অনুদ্বৈপায়নের বাবার কাছে আসে। জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহিবল থেকে সংশ্লিষ্ট মহকুমা প্রশাসকের নিকট থেকে দু হাজার টাকার চেক উত্তোলনের জন্য এ চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। অনুদ্বৈপায়ন ভট্টচার্যের পরিবারের সদস্যরা তখনই নিশ্চিত হন যে, তাদের প্রিয়জন সত্যি সত্যি একাত্তরে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী কৃর্তক নিহত হন। তখনো তারা আশায় বুক বেঁধে ছিলেন- হয়তো বা তিনি বেঁচে আছেন এবং লন্ডনে অবস্থান করছেন । হয়তো কোন একদিন বাড়িতে ফিরে আসবে তাদের আদরের বড় ছেলে ঝুনু। পরবর্তীতে অনুদ্বৈপায়নের বাবা দিগেন্দ্র ভট্টাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের সাথে দেখা করেছিলেন। রমনা থানা থেকে বড় ছেলে শহীদ অনুদ্বৈপায়নের মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করেছিলেন। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই শহীদ অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়নের কথা জানেন না। দেশে স্বাধীন হওয়ার পর জগন্নাথ হলের সংসদ ভবনের নাম রাখা হয়েছিল অনুদ্বৈপায়ন ভবন। ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় আকস্মিক ভবনটি ভেঙ্গে পড়ার অনেক ছাত্রের মৃত্যু হয়। নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে পুনঃনির্মিত ভবনটির নাম রাখা হয় অক্টোবর ভবন। জগন্নাথ হল কর্তৃপক্ষ বর্তমান অক্টোবর ভবনের একটি কক্ষ অনুদ্বৈপায়ন পাঠাগার হিসেবে তাঁর স্মৃতিকে ধরে রেখেছেন।

স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছরে অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকে নিয়ে লেখালেখি খুব একটা হয়নি।

শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য
শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য

১৯৯২ সালে তাঁকে নিয়ে ডাক টিকেট প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। জাতীয় শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে জাতির কাছ থেকে অনুদ্বৈপায়নের পাওয়া মর্যাদার দিকটা বাদই দিলাম, যারা হবিগঞ্জের সন্তান হিসেবে শহীদ অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের নাম উচ্চারণ করি গর্বের সাথে, তারা কি করেছি। আজ যারা নবীগঞ্জ জে,কে,উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে, তারা কি জানে ১৯৬১ সালে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সেরা রেজাল্ট দেখিয়ে পরবর্তীকালে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হয়েছিলেন তাদেরই একজন। স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতেই ঘাতকদের গুলিতে প্রাণ দিয়ে অগ্রজ শহীদের মর্যাদা লাভ করা মানুষটি আমাদেরই স্বজন, পথপ্রদর্শক। নিঃসন্দেহে এ খবর রাখে না কোন শিক্ষার্থী, কারণ পরিচয়ের যোগসূত্র কেউ তৈরি করে দেয়নি। ২০০০ সালে নবীগঞ্জ গণপাঠাগারের উদ্দ্যোগে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মরহুম হাবিবুর রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রব সাদী ও সিলেট মদন মোহন কলেজের অধ্যক্ষ আবুল ফতেহ ফাত্তাহ এর প্রচেষ্টায় উজ্জ্বল দাশের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ’মৃত্যুঞ্জয়ী প্রজ্ঞাবান’ শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য স্মারক গ্রন্থ। যেখানে অনুদ্বৈপায়নকে নিয়ে লিখেছেন তাঁর শৈশব থেকে মৃত্যুর সময় পর্যন্ত নানা সময়ের কাছের মানুষরা।

স্বাধীনতার পর নবীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে তাঁর গ্রাম জন্তরী পর্যন্ত রাস্তার নামকরণ করা হয়েছিল অনুদ্বৈপায়ন সড়ক। কালের গর্ভে সেটি এখন কলেজ রোড নামেই অধিক পরিচিত। এখন আর কোথাও চোখে পড়েনা না অনুদ্বৈপায়নের নাম। আর অনুদ্বৈপায়ন সড়ক ফলকটিও মাটি চাপা পরেছে এক যুগের উপর। নতুন প্রজন্ম বঞ্চিত হয়েছে তাদের পূর্বসুরিদের সম্পর্কে জানতে।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও অনুদ্বৈপায়নের পরিবারের সহযোগিতায় শহীদের নামে মাধ্যমিক স্কুল তৈরীর উদ্দ্যোগ শেষ পর্যন্ত আর আলোর মুখ দেখেনি। বাড়িতে শহীদ অনুদ্বৈপায়নের স্বজন বলতে ছোটবোন প্রীতিলতা। ভাইয়ের স্মৃতি তাঁকে কুড়ে খায়। শহীদের পরিবার হিসেবে কেউ তাদের খবর রাখেনা। একজন জাতীয় বুদ্ধিজীবীকে রাষ্ট্র না হয় বিস্মৃত হিসেবে আড়াল করে রাখল, শহীদের জন্মস্থানের মানুষ, মাটি তাঁকে কি করে ভুলে থাকে। একবার ভেবে দেখুন, যাঁদের রক্তে স্নাত এই দেশ, তাঁদের ভুলে কি করে আমরা প্রতিটা ভোরের সূর্য দেখি!

শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য
শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য

ujjal0027@gmail.com

Share This Post

Post Comment