জাতীয় পত্রিকার স্বীকৃতি চাই না, দৈনিক আজাদী চট্টগ্রামেরই পত্রিকা

ইউকে বাংলা প্রেস ক্লাবের সংবর্ধনা সভায় দৈনিক আজাদী সম্পাদক

M a malerkপ্রেস বিজ্ঞপ্তিঃ  সফররত দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, আজাদী পত্রিকা প্রায়ই ৪০ বছর ধরে লোকসান দিয়ে চালিয়েছে, তবুও এটির প্রকাশনা বন্ধ করি নি। ঢাকা থেকে প্রকাশিত অনেক শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের চেয়ে আজাদীর প্রচার সংখ্যা অনেক বেশি হলেও শুধুমাত্র চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় বলেই এটি এখনো মফস্বলের পত্রিকা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছা করলেই ঢাকা থেকে প্রকাশ করে জাতীয় দৈনিক হিসেবে প্রচার করতে পারি। তবে, আমরা তা করবো না। কারণ, আজাদী চট্টগ্রামের অহংকার, চট্টগ্রামেরই থাকবে।

ইউকে-বাংলা প্রেস ক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সোয়েব কবীরের পরিচালনায় ও ইউকে বাংলা প্রেস ক্লাবের আহবায়ক রেজা আহমেদ ফয়সল চৌধুরী শোয়াইবের সভাপতিত্বে ইউকে-বাংলা প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে গত ২০ নভেম্বর শুক্রবার পূর্ব লন্ডনের মিডিয়া ক্লাবে আয়োজিত এক সংবর্ধনা ও মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

দৈনিক আজাদীর শুরুর ইতিহাস সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাঙালির আশাভঙ্গের ইতিহাস শুরু হয়। নানা অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হতে থাকে পূর্ব পাকিস্তান। অবহেলিত পূর্ব পাকিস্তানের আরো অবহেলিত একটি শহরের নাম চট্টগ্রাম। এই প্রিয় শহরটির পিছিয়ে থাকা এই প্রথম মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার আমার বাবা আলহাজ্ব আবদুল খালেককে ভীষণ কষ্ট দিত। ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নানা লোভনীয় পদে চাকুরীর সুযোগ পেলেও তা গ্রহণ করেননি। তৎকালীন চট্টগ্রাম থেকে দুইটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো ইংরেজী ভাষায়। এগুলো আমাদের ছাপাখানা থেকেই প্রকাশ করা হতো। এসব দেখে আমার বাবা আলহাজ্ব আব্দুল খালেক নিজেই উদ্যোগী হয়ে চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের কথা বলার জন্য ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করেন দৈনিক আজাদী। আজ থেকে ৫৬ বছর আগেকার সেদিনের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও কেবলমাত্র চট্টগ্রামের মানুষের অভাব অভিযোগের কথা বলার জন্য তিনি দৈনিক আজাদী প্রকাশ করেছিলেন।

তিনি আরো বলেন, নানা ধরনের ঘাত প্রতিঘাত এবং বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে সেদিনের দৈনিক আজাদী তিল তিল করে গড়ে ওঠে। দৈনিক আজাদী পরিণত হয় চট্টগ্রামের মানুষের অদ্বিতীয় মুখপাত্র হিসেবে। প্রকাশনার শুরু থেকে দৈনিক আজাদী অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সেই আদর্শ আজো ধরে রেখেছে এবং ধরে রাখার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।

তিনি আরো বলেন,  আমাদের নিজস্ব মালিকানাধীন কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেস থেকেই দৈনিক আজাদীর প্রকাশনা শুরু হয়। এই প্রেসও বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম স্বাক্ষী। হয়তোবা আঞ্চলিক তথা চট্টগ্রামের প্রেস বলে  এটির জাতীয় কোন স্বীকৃতি মেলে নি।  দেশ ও জাতির স্বার্থে কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেস খেকেই একুশের প্রথম কবিতা “কাঁদতে আসি নি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি” ছাপা হয়।

তিনি আরো বলেন, বৃটেনে এসে আজকের এই অনুষ্ঠানে ইউকে বাংলা প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা পেয়ে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করছি। আমি শুধুমাত্র আমার বাবার গড়ে তোলা আজাদী পত্রিকায় আমারা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। ৫৬ বছর পর এসে চট্টগ্রামবাসীর কাছ থেকে দৈনিক আজাদীর চাওয়া পাওয়ার কিছুই নেই। চট্টগ্রামবাসীর ভালোবাসার কাছে আজাদী পরিবার আজীবন ঋণী।

 

সাপ্তাহিক লন্ডন বাংলার প্রধান সম্পাদক কে এম আবু তাহের চৌধুরী বলেন, বিলেতের বাংলা মিডিয়ার ৯৯ বছর হতে চলেছে। এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমা অনেক সংবাদ পত্র প্রকাশিত হয়েছে এবং নানা কারণে বন্ধও হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায়ই ২০ টি মিডিয়া রয়েছে। প্রতিদিনের সংবাদ নিয়ে দৈনিক আজাদী পাঠকদের মন জয় করেছে বলেই হাটি হাটি পা পা করে ৫৬ বছর প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে। এটি আমাদের জন্য একটি অনুপ্রেরণার বিষয়।

বেতার বাংলা‘র প্রধান নির্বাহী নাজিম চৌধুরী বলেন, দৈনিক আজাদীর সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক। ছোট বেলা থেকেই দৈনিক আজাদী আমাদের পরিবারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঠিক তেমনি, দৈনিক আজাদী আজ কেবল চট্টগ্রামের প্রাচীন দৈনিকই নয়, এটি এই অঞ্চলের মাটি ও মানুষের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বৃহত্তর চট্টগ্রামের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রামসহ সবকিছুকে ধারণ করে দৈনিক আজাদী গত অর্ধ শতকের বেশি সময় ধরে নিজেই হয়ে উঠেছে চাটগাঁবাসীর, দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও গৌরবের অংশ।

বাংলাদেশ সরকারের বিনিয়োগ বোর্ডের কনস্যুলার এম এ গণি বলেন, ইতিহাসের এক প্রতিকূল আর্থসামাজিক রাজনৈতিক অবস্থায় প্রথমে ‘সাপ্তাহিক কোহিনূর’ এবং পরে ‘দৈনিক আজাদী’ প্রকাশ করে ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক সমগ্র চট্টগ্রামকেই আলোকিত ও সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি আমাদের জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক ভাস্বর মিনার। তারই ধারাবাহিকতায় আজাদী দীর্ঘ ৫৬ বছরের প্রকাশনা অব্যাহত রাখা দুঃসাধ্য ব্যাপার।

বিমান বাংলাদেশ এর ইউকে কান্ট্রি ম্যানেজার মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে দৈনিক আজাদী একটি চলমান অধ্যায়। ১৯৬০ সাল থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রামবাসীকে সুখ, দুঃখকে সাথী করে এটি ইতিহাসের পাতায় প্রতিদিন স্থান করে নিচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হলেও দৈনিক আজাদী আধুনিকতা ও মানের দিক দিয়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত শীর্ষস্থানীয় জাতীয় পত্রিকাগুলোর চেয়ে কোন অংশেই কম নয়, বরং এগিয়ে আছে অনেক ক্ষেত্রে।

টাওয়ার হ্যামলেটস এর সাবেক মেয়র মতিনুজ্জামান বলেন, যতদূর জেনেছি চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সব প্রেক্ষাপটেই দৈনিক আজাদীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই এই বৃটেনে বসেও দৈনিক আজাদী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা হিসেবে দৈনিক আজাদী বিরল ইতিহাসের স্বাক্ষী  – বিষয়টি জানার পর আজকে এই অনুষ্ঠানে আসতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে।

সভাপতির বক্তব্যে ইউকে বাংলা প্রেস ক্লাবের আহবায়ক রেজা আহমেদ ফয়সল চৌধুরী শোয়াইব বলেন, বাংলাদেশের ইতিহসে দৈনিক আজাদী নিজেই একটি সুদৃঢ় অবস্থান সৃষ্টি করে নিয়েছে। কোটি পাঠকের এই দৈনিকের সম্পাদককে আমাদের মাঝে পেয়ে আমরা সত্যিই গর্বিত। আমরা চাই এই গুণী মানুষটির হাত ধরেই আজাদীর প্রকাশনা আরো বেগবান হোক।

জিএমজি কার্গো ও ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ার সার্বিক সহযোগিতা এই অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ব্রিটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের মেম্বারশীপ ডিরেক্টর মনির আহমেদ, সাপ্তাহিক বাংলা টাইমস এর সম্পাদক সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাসন, বিমান বাংলাদেশ এর সাবেক কান্ট্রি ম্যানেজার মোহাম্মদ আলী, বাংলা নিউজ ইউরোপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রব মল্লিক, ইউকে বাংলা প্রেস ক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল আউয়াল মামুন, বাংলা টাইমস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ নাসির, ব্যারিস্টার তাহমিনা কবীর, সাপ্তাহিক বাংলা সংলাপ সম্পাদক মোশাহিদ আলী, চ্যানেল এস এর হেড অব চ্যারিটি তৌহিদুল করিম মুজাহিদ, মিজানুর রহমান লিংকন, বাংলা টিভির সিনিয়র নিউজ এডিটর সরওয়ার হোসাইন প্রমুখ।

Share This Post

Post Comment