চাপাতির নীচে বাংলাদেশ

 জুয়েল রাজঃ দাউদ হায়দার ‘কালো সুর্য্যের কালো জ্যোত্স্নায় কালো বন্যায়’ নামে একটি কবিতা লেখার কারণে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ ছাড়েন ১৯৭৩ সালে । ঢাকার কোন এক কলেজের শিক্ষক ঢাকার একটি আদালতে এই ঘটনায় দাউদ হায়দারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন। আজ পর্যন্ত দেশে ফিরতে পারেননি দাউদ হায়দার।
এরপর ১৯৯৪ সালে মে মাসে তসলিমা নাসরিন দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে ইসলামি ধর্মীয় আইন শরিয়া অবলুপ্তির মাধ্যমে কুরআন সংশোধনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, বলে প্রচারণা চালানো হয়। এর ফলে ইসলামি মৌলবাদীরা তাঁর ফাঁসির দাবী জানাতে শুরু করে। তিন লাখ মৌলবাদী একটি জমায়েতে তাঁকে ইসলামের অবমাননাকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দালাল রূপে অভিহিত করে। দেশ জুড়ে তাঁর শাস্তির দাবীতে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়।বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে জনগণের ধর্মীয় ভাবনাকে আঘাত করার অভিযোগে মামলা রুজু করা হয় এবং জামিন-অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। গ্রেপ্তারী এড়াতে পরবর্তী দুই মাসে লুকিয়ে থাকার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে তাঁর জামিন মঞ্জুর করা হয় এবং তসলিমা বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। আজ অবধি দেশে ফিরে যেতে পারেন নি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন এরপর থেকে।
২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে বাংলা একাডেমীর উল্টো পাশের ফুটপাতে হামলার শিকার হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ। ১১ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে । সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল চাপাতি আক্রমণের। এর কয়েক মাস চিকিৎসা নেয়ার পর ২০০৪ সালের অগাস্টে গবেষণার জন্য জার্মানিতে যান এই লেখক। পরে ওই বছর ১২ অগাস্ট মিউনিখে নিজের ফ্ল্যাট থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।সেই রহস্য আজো উদঘাটিত হয়নি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে মৌলবাদ। মূলত ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু কে হত্যার মধ্যদিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে মৌলবাদী গোষ্ঠী। অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধ্বের পিঠে ছুরি মেরে ধর্মান্ধ অসহিষ্ণু একটা রুপে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। জেএমবি, বাংলা ভাই, হরকাতুল জিহাদ, হিজবুত তাহরি সহ নানা উগ্রমতবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশে এক সময় তাঁদের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। রমনার বটমূল, বিভিন্ন সিনেমা হল, বিভিন্ন জনসভায় বোমা হামলা , বাংলা ভাইয়ের মানুষ পিঠিয়ে হত্যার উৎসব দেখেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এইভাবে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার উৎসব শুরু হয়েছে ২০১৩ সাল থেকে। রাজীব হায়দার শোভন কে নিজ বাসার সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আশ্চর্য্য জনক বিষয় হলো খুনীদের বারবার পরিচয় করে দেয়া হয়েছে দূর্বৃত্ত। যেখানে বিষয়টি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার একদল উগ্র ইসলামী মৌলবাদী গোষ্ঠী এই ঘটনা গুলো ঘটিয়েছে। এরপর একে একে জগতজ্যোতি, আরিফুর রহমান দ্বীপ, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু , অনন্ত বিজয় দাস, নীলয় নীল, সর্বশেষ জাগৃতি প্রকাশনার ফয়সল আরেফিন দীপন কে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ফিরে এসেছেন আহামেদুর রশীদ টুটুল, রনদীপম বসু ও কবি রহিম তারেক। শুরু হয়েছিল কবি, লেখক হুমায়ুন আজাদ দিয়ে এর পর ব্লগার, সেখান থেকে প্রকাশক,পুলিশ, নডুলস বিক্রেতা, বিদেশী কেউই বাদ পরেনি। এর পর কার জন্য অপেক্ষা করছে চাপাতি আমরা কেউ জানি না। রাষ্ট্র ও সরকারের একার পক্ষে কি এই সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব? শুধুই কি নাস্তিকতার জন্য এই চাপাতি উৎসব? যাদের কে রীতিমত ঘোষনা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নাস্তিকতার। এই অভিযোগ আদৌ কতোটা সত্য? কোন ধরণের ব্লগ না পড়েই হত্যাকারীদের প্রচারণায় প্ররোচিত হয়ে হত্যাকান্ড গোলকে এক ধরণের মানসিক স্বীকৃতী দিয়ে দিচ্ছেন অনেকেই যার ফলে খুনীরা বেপোরোয়া হয়ে উঠেছে দিন দিন।সন্দেহ ভাজন হিসাবে প্রত্যেক খুনের পরে পুলিশ আটক করেছে অনেককে। অনেকে আবার জামিনে মুক্তি ও পেয়েছে। শম্বুক গতিতে অগ্রসর হচ্ছে বিচার প্রক্রিয়া।
সিলেটের কিশোর রাজন হত্যা মামলা কিংবা খুলনার রাকিব হত্যা মামলা যে ভাবে দ্রুত গতিতে রায় হয়েছে, রাজীব হত্যা কিংবা অভিজিৎ হত্যা মামলার রায় যদি দ্রুত আলোর মুখ দেখত পরবর্তী হত্যাকান্ড গুলো না ও ঘটতে পারত। আই এস কিংবা আনসার উল্লা নানা নামে এই হত্যাকান্ড গুলোর দায় স্বীকার করে নিচ্ছে। সরকার বলছে বাংলাদেশে জঙ্গী নাই। এ যেন উটপাখীর মতো বালিতে মুখবুঝে মেনে নেয়া। দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিচারের আগে সারা দেশে কি পরিমান তান্ডব চালানো হয়েছিল। ঠিক একই প্রক্রিয়ায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মতিউর রহমান নিজামীর বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতেই এসব হত্যাকান্ড ঘটে থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
ধর্মানুভূতি তে আঘাত বলে বলে দেশের সাধারণ মানুষ ও পরোক্ষ ভাবে খুনকেই উৎসাহিত করছেন।

হুমায়ুন আজাদ বহু আগেই এই ধর্মানূভূতি নিয়ে লিখে গেছেন ‘’ ধর্মানুভূতি কোনো নীরিহ ব্যাপার নয়, তা বেশ উগ্র; এবং এর শিকার অসৎ কপট দুর্নীতিপরায়ণ মানুষেরা নয়, এর শিকার সৎ ও জ্ঞানীরা; এর শিকার হচ্ছে জ্ঞান। জ্ঞানের সাথে ধর্মের বিরোধ চলছে কয়েক সহস্রক ধ’রে, উৎপীড়িত হ’তে হ’তে জয়ী হচ্ছে জ্ঞান, বদলে দিচ্ছে পৃথিবীকে; তবু আজো পৗরাণিক বিশ্বাসগুলো আধিপত্য করছে, পীড়ন ক’রে চলছে জ্ঞানকে। ধর্মানুভূতির আধিপত্যের জন্যে কোনো গুণ বা যুক্তির দরকার পড়ে না, প্রথা ও পুরোনো বই যোগায় তার শক্তি, আর ওই শক্তিকে সে প্রয়োগ করতে পারে নিরঙ্কুশভাবে। উগ্র অন্ধ ধর্মানুভূতি বিস্তারের পেছনে কাজ করে দারিদ্র্য, অশিক্ষা, দুর্নীতি ও রাজনীতি। দরিদ্রের শিক্ষালাভের সুযোগ নেই, তাই জ্ঞানের সব এলাকাই তার অজানা; তার জ্ঞানহীন মনের ভেতর প্রতিবেশ সহজেই সংক্রামিত করে অযুক্তি ও অপবিশ্বাস; আর তাতে সে খুঁজে পায় শান্তি ও শক্তি। তার কিছু নেই ব’লে তার সাথে থাকে এক অলৌকিক মহাশক্তি, যা তাকে বাস্তবে কিছু দেয় না, কিন্তু মানসিকভাবে সবল ক’রে রাখে। দুর্নীতি ধর্মের পক্ষে কাজ করে; দুর্নীতিপরায়ণ মানুষেরা নিজেদের অপরাধ ঢেকে রাখার জন্যে জাগিয়ে তোলে ধর্মীয় উগ্রতা। তাই সমাজে যতো দুর্নীতি বাড়ে ততো বাড়ে ধর্ম। রাজনীতিবিদেরাও ব্যবহার করে ধর্মকে; তারা দেখতে পায় ক্ষমতায় যাওয়ার সহজ উপায় ধর্মের উদ্দীপনা সৃষ্টি; তাদের কল্যাণ করতে হয় না মানুষের, বিকাশ ঘটাতে হয় না সমাজের- এগুলো কঠিন কাজ; সবচেয়ে সহজ হচ্ছে ধর্মকে ব্যবহার ক’রে ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকা। কিন্তু এতে সমাজ নষ্ট থেকে নষ্টতর হ’তে থাকে, যা এখন ঘটছে বাঙলাদেশে।‘’

হুমায়ুন আজাদের ধারণাই বাংলাদেশে সত্য হয়েছে। প্রগতীশীল সুশীল সমাজ ও কেন যেন সাধারণ মানুষের ভাবনার বাইরে যেতে পারছেন না। অনুভুতির বাইরে গিয়ে নিজেকে নিরাপদ মনে করছেন। কিন্তু আজ আর কেউ নিরাপদ না । উদ্যত চাপাতি যে কোন সময় আঘাত আনবে । জার্মান কবি মার্টিন নেমলারের কথা গুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহুল ভাবে শেয়ার হচ্ছে সম্প্রতি সময়ে যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন শতভাগ প্রযোজ্য। ‘’ যখন ওরা প্রথমে কমিউনিস্টদের জন্য এসেছিলো, আমি কোন কথা বলিনি, কারণ আমি কমিউনিস্ট নই। তারপর যখন ওরা ট্রেড ইউনিয়নের লোকগুলোকে ধরে নিয়ে গেল, আমি নীরব ছিলাম, কারণ আমি শ্রমিক নই। তারপর ওরা যখন ফিরে এলো ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে ভরে মারতে, আমি তখনও চুপ করে ছিলাম,কারণ আমি ইহুদি নই। আবারও আসল ওরা ক্যাথলিকদের ধরে নিয়ে যেতে, আমি টু শব্দটিও উচ্চারণ করিনি,কারণ আমি ক্যাথলিক নই। শেষবার ওরা ফিরে এলো আমাকে ধরে নিয়ে যেতে, আমার পক্ষে কেউ কোন কথা বলল না, কারণ, কথা বলার মত তখন আর কেউ বেঁচে ছিল না। ‘’
একের পর এক তালিকা করে বুদ্ধ্বিজিবী, শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিককে প্রতিদিন হুমকি দেয়া হচ্ছে, যদি ও এইসব তালিকা নিয়েও বিতর্ক আছে। একে একে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে মেধাবী একটি প্রজন্ম। অনেকে আবার ফিরতে পারছেন না দেশে। অন্ধকারের কাছেই আত্মসমর্পণ করছে বাংলাদেশ।
তাই চাপাতি শুধু এখন আর ব্লগার লেখকের মাথার উপর নয়, আর্মি, পুলিশসহ চাপাতির নীচে ৫৬ হাজার বর্গমাইল সাড়া বাংলাদেশ। তাই এসব হত্যাকান্ডের শুধু প্রতিবাদ নয় প্রতিরোধ জরুরী।

Share This Post

Post Comment