তাঁর সাথে সুন্দরবনে…

humayun-ahmed-portrait-booksশাকুর মজিদ: মাত্র ১০ দিন আগে আমাদের পঞ্চ পর্যটকসহ একদলের সাথে সুন্দরবন ঘুরে এসেও আরেকবার ৫ দিনের জন্য সুন্দরবনের জাহাজে উঠতে হলো। তার কারন, অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাযহারুল ইসলামের কঠিন আবদার। এই আবদারের মধ্যে একটি বাক্য ছিলো এমন যে, ‘লেখক হুমায়ূন আহমেদের আদেশ-তাঁর প্রিয় যে মানুষগুলোকে নিয়ে তিনি সুন্দরবন দেখতে চান, তার মধ্যে তুমি আছো এবং তোমাকে যেতেই হবে। ’

২০০৯ সালের ১১ জানুয়ারী। সদরঘাট থেকে ঢাকা ইমপেরিয়্যাল কলেজের তেতলা জাহাজটি ছাড়তে ছাড়তে প্রায় সন্ধ্যা। এই কলেজটি এর আগের ৫ বছর ধরেই তাদের ছাত্র ছাত্রী ও অভিভাবকদের নিয়ে এমন আয়োজন করে এসেছিল। প্রতি বছরই ছাত্র-ছাত্রী-অভিভাবক সহ সুন্দরবন বেড়াতে যায়। এর প্রিন্সিপাল মাহফুজুল হক এ দিয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করে রেখেছেন। এই করিৎকর্মা অধ্যক্ষ মহোদয়ের আয়োজনও নিঁখুত। জাহাজের ডেকেই গরু-ছাগল বাঁধা, ডীপ ফ্রিজ ভর্তি মাছ তরকারী। আয়োজনের কমতি নাই কোথাও। শ’তিনেক ছাত্র-ছাত্রী অভিবাবক ঠাই নিয়েছেন নীচ ও দোতলায়। তেতলার কেবিনগুলো কলেজের সস্ত্রীক প্রিন্সিপাল আর হুমায়ূন আহমেদের বন্ধুদের জন্য। এই বন্ধুতালিকায় আছেন হুমায়ূন আহমেদের কলেজ জীবণের বন্ধু স্থপতি করিম, প্রকৌশলী সেহেরী, আছে মাসুদ আকন্দ, অন্যপ্রকাশ গ্রুপের সপরিবারে মাজহার, কমল আর নাসের। এই বন্ধুতালিকার সাথে নতুন সংযোগ লেখক রশীদ হায়দার। এর মধ্যে বেশীর ভাগই সস্ত্রীক, কাচ্চা-বাচ্চা সহ, তিনজন মাত্র সিঙ্গেল। রশীদ হায়দার, আমি আর মাসুদ আকন্দ। সিঙ্গেলরা সিঙ্গেল বেডের কেবিনে, ডাবলরা ডাবল কেবিনে। হুমায়ূন আহমেদ ৩ বছরের শিশু নিষাদকে নিয়ে আমার পাশের কেবিনে।

এক সময় শুরু হয় আমাদের সুন্দরবনমুখী যাত্রা। সদরঘাট ক্রমশ পার হয়ে যায় এবং ঢাকা শহর আমাদের দৃষ্টির আড়াল হতে হতে ক্রমশ রাত নেমে আসে। শীতের রাতে বাইরের ডেকে খুব বেশীক্ষণ বসাও যায় না। অন্ধকারের মধ্যে নদী বা সমুদ্র যাত্রায় কোনো ফারাক নাই। কিছুক্ষণ ‘ডেক’ এ বসে অন্ধকার দেখে দেখে আর কিছুক্ষণ কেবিনের মধ্যে আড্ডা দিয়ে আমরা যে যার কেবিনে ঘুমিয়ে পড়ি।
পরদিন সকালটা অন্যরকম হয়ে দেখা দিলো। নদীর বুকে শীতের সকালটা দেখার জন্য ঘুম ভাঙতেই কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে দেখি হুমায়ূন আহমেদ একা একা পায়চারি করছেন সামনের করিডোরে। পেছনে হাত দিয়ে হেঁটে এপার থেকে ওপার যাচ্ছেন। একপলক আমাকে দেখেই ‘গুডমনিং’ বলে আবার হাঁটতে শুরু করেন। আমি রেলিং ধরে দাড়িয়েই থাকি। তিনি একটা চক্কর দিয়ে এসে দাঁড়ান। বলি ‘স্যার, আপনি কি সব সময় এমন হাঁটেন, নাকি এটা মর্নিং ওয়াকের বিকল্প?’
স্যার বলেন, ‘হাঁটি প্রায়ই। বাসায় ও হাঁটি। এই হাঁটার সময় লেখা জমাই মনে মনে। শোনো, তখন নুহাশ অনেক ছোট। একদিন আমাকে বলে, আমি কখনও লেখক হবো না। আমি বললাম-কেন? ও বললো-লেখকদের ঘরের মধ্যে অনেক হাটাহাটি করতে হয়। আমি হাঁটাহাঁটি করতে পারবো না।’ একটু বলে একটা মুচকি হাসি দিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলেন।

কিছুক্ষণ পর নাস্তা আসে আমাদের করিডোরে। এই জাহাজের নীচতলায় ডাইনিং রুম। লম্বা টেবিল বিছানো আছে। বাকী সবাই ঠিক সময় মতো খেতে যায় ওখানে। তেতলার এই অতিথিদের জন্য অন্য নিয়ম। তাদের খাবার আসে উপরে।
নীচের ডাইনিং টেবিলে খেতে বসে কাল রাতে মহা ঝামেলায় পড়ে যান ইমপেরিয়েল কলেজ প্রিন্সিপাল মহোদয়। সবার খাবার শেষে রাত বারোটায় হুমায়ূন আহমেদ তার সব সাঙ্গ নিয়ে খেতে গেলেন নীচে। খাবার মেনুতে ছিলো পোলাও, মুরগীর রোস্ট, গরুর মাংস ভুনা, সবজি।
খেতে বসেই গন্ডগোল পাকান হুমায়ূন আহমেদ। প্রায় চিৎকার করে বলেন, ‘কোন বাবুর্চি এই রোস্ট রেঁধেছে, তাকে ডেকে আনো। ’
যথারীতি বাবুর্চিকে নিয়ে আসা হলো। তাকে জিগ্যাসা করা হলো-আপনি রোস্টের মধ্যে চিনি দিয়েছেন কেন? বাবুর্চির কাঁপাকাঁপি অবস্থা। কোনো যুক্তিই স্যারের কাছে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। তিনি কোনো অবস্থায়ই আর খাবার খাবেন না। মাযহারকে বলা হলো, এক্ষুনি তার বাবুর্চিকে যেনো নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়, কিংবা তাঁকে ঢাকায় ফেরত পাঠানো হয়। এই বাবুর্চির চিনি মাখা মিষ্টি রোস্ট তিনি খাবেন না।
তার সামনের প্লেট প্রায় ছুড়ে ফেলেই তিনি হাত ধুয়ার ব্যবস্থা করলেন এবং খাবার টেবিল থেকে উঠে গেলেন। ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো সমস্যা হচিছলো না। আমি এবং অন্য কয়জন ভরপেট খেলাম। স্যার খেলেন না, তাই শাওন ও খেলো না, মাযহারও না।
ভরপেট খাবার শেষে আমি আস্তে আস্তে তেতলার কেবিনের সামনে গিয়ে দেখি বেশ গম্ভীর একটা পরিবেশ। দু’টো চেয়ার নিয়ে স্যার আর শাওন বসে আছে। মাযহার তটস্থ।
মিনিট বিশেকের মাথায় কলেজের প্রিন্সিপাল নিজ হাতে খাবর নিয়ে এসে হাজির। সাথে নিয়ে এসেছেন চিনির রস মেশানো বাবুর্চিকে। বাবুর্চি পেছনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে। অনেক অনুনয় বিনয় করে অনেকবার ক্ষমা প্রার্থনা করার পর নতুন রান্না করা মুরগির তরকারী সামনে নিয়ে তিনি খেতে বসলেন। খেলেনও। কিন্তু মুরগির রোস্টটা ছু’লেনও না। পোলাও এর সাথে গরুর মাংশ ভুনা দিয়েই শেষ হলো তার খাওয়া। আসলে, গরুর মাংশ মুুরগির মাংশের চেয়ে তার অধিক পছন্দের ছিলো। [আমার ধারণা, শুধু গরুর মাংশ দিয়ে খাওয়ার জন্য একটা উছিলা তৈরী করছিলেন তিনি।]
হুমায়ূন আহমেদ খাবারের ব্যাপারে সব সময়ই অনেক চুজি। তাঁর খাবারের অভ্যাসের কথা তাঁর স্বজনেরা জানেন। তিনি ফার্মের মুরগী, পাখীর মাংশ কখনো খান না। পরপর দুই বেলা একই তরকারী খাবেন না। দিনে মাছ খেলে রাতে মাংশ চাই। খাবারের শেষে মিষ্টি জাতীয় কিছু খাবেনই। হয় রসগোল্লা, না হয় শনপাপড়ি। তাঁকে দাওয়াত খাইয়ে সব সময় যে সবাই পুলকিত হবেন এমন ভাবার কারন নাই। এক বাসায় খাওয়ার পর বললেন, ভাবী, আপনার সবগুলো আইটেমের মধ্যে সেভেন আপটাই শুধু পারফেক্ট ছিলো।
বিয়ে বাড়ির দাওয়ার খেতে গিয়ে তিনি বাবুর্চিকে ডেকে এনে কান ধরে উঠ-বস ও করিয়েছেন, এমন কথা তার স্বজনেরা জানেন। সুতরাং তাঁর জন্য রান্নার পৃথক ব্যবস্থা না হলেও অত্যন্ত সতর্ক এই নৌ-বিহারের আয়োজকেরা। সকালে নাস্তার টেবিলে ভাজা ও সেদ্ধ ডিম, লুচি-পরোটা-গরুর মাংশ-সবজি-সুজি আর কলা। এখান থেকে স্যারের যা পছন্দ খাবেন, এমন আয়োজন করে রেখেছেন তারা। আমরা তার সাঙ্গ, সুতরাং সব খাবারের ভাগিদার আমরাও।
আমাদের চমৎকার দিন শুরু হয় সকালের আলোয়। শীতের সকালে মিষ্টি রোদের কিছুটা পড়েছে জাহাজের বারান্দায়, কিছুটা আটকে আছে ছাদের চালে। প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে এসে ছায়ায় বসে আছেন সবাই। স্যার হঠাৎ বললেন, আমি ভুল করে কোনো রিডিং মেটেরিয়্যাল নিয়ে এলাম না, তুমি কিছু এনেছো?
বললাম, না স্যার। আমার একটা বইয়ের ফাইনাল প্রুফ ছাড়া কিছু নাই।
স্যারকে কে একজন যেনো একটা ইংরেজী বই এনে দিলো। পেপারব্যাক এর বই। তিনি পড়তে শুরু করলেন। ২ পৃষ্টা পড়ে বই ফেরত দিয়ে দিলেন। ‘নাহ-কনসেনট্রেট করতে পারছি না’। আবার বলেন-‘এমন কখনো হয় না, আমি বেড়াতে গেলে সব সময় কিছু বই আমার সঙ্গে থাকে। এবার কী ভূলটাই না করলাম।’
পাশে বসেছিলেন রশীদ হায়দার। গল্প শুরু হয়ে গেলো। রশীদ হায়দার কিন্তু স্যারের বন্ধু তালিকার অতিথি ছিলেন না। তিনি আয়োজক কলেজের প্রিন্সিপাল মাহফুজুল হকের আপন খালাতো ভাই। এই সূত্রে আসা। হুমায়ূন আহমেদও এই নৌসফরে সঙ্গী শুনে রশীদ হায়দার একটু অতিরিক্ত আগ্রহীও হয়েছিলেন।
হুমায়ূন আহমেদই এক সময় রশীদ হায়দারের সাথে তাঁর পরিচয়ের সূত্রপাতের ঘটনা বললেন।
এক সময় রশীদ হায়দার বাংলা একাডেমীর উপপরিচালক ছিলেন-‘উত্তরাধিকার’ নামক বাংলা একাডেমীর সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করতেন। একদিন হুমায়ূন আহমেদ একটা গল্প নিয়ে গেছেন-‘উত্তরাধিকার’ এর জন্য।
গল্পটা হাতে নিয়েই না পড়ে তিনি ছাপার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। রশীদ হায়দার এবং হুমায়ূন আহমেদ উভয়েই জানতেন যে, ‘উত্তরাধিকার’ এ ‘ভারী, ভারী’ লেখা ছাপা হয়। সেখানে তারা হুমায়ূন আহমেদের লেখা ছাপবে কী না, এ নিয়ে সংশয় ছিলো।
রশীদ হায়দার বলেন, তখন হুমায়ূন স্বনামেই বিখ্যাত। তার নাম ছড়িয়ে গেছে সব জায়গায়। সুতরাং তার লেখা ভালো হলো কী মন্দ হলো, এটা সে বঝুবে আর তার পাঠক বুঝবে। লেখা খারাপ হলে পাঠক বাংলা একাডেমীকে গালি দিবে না, হুমায়ূনকে দেবে। সুতরাং আমি ঝুকি নেবো কেনো? আমি গল্পটি ছেপেছি।
রশীদ হায়দারকে পেয়ে আমার অনেক লাভ হয়ে যায়। আমার ‘সক্রেটিসের বাড়ি’ বইটির ফাইন প্রুফ কপি আমার হাত থেকে টেনে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন এবং নিজে উদ্যোগী হয়ে অবিরাম বানান ঠিক করতে শুরু করেদিলেন। আমার আর কোনো কাজ থাকলো না এই জাহাজের মধ্যে। আমি আমার ক্যামেরা যুগল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আপাততঃ মাযহারের ছেলে অমিয় আমার প্রেজেন্টার। তাকে মাইক্রোফোন ধরিয়ে বললাম, তুমি যা ইচ্চা করো, আমি রেকর্ড করি। সে প্রথমেই গেলো হুমায়ূন আহমেদের কাছে।
অমিয় : আচ্ছা, এ মুহুর্তে আপনার কেমন লাগছে?
হুমায়ূন : খুব ভালো লাগছে
অমিয় : আপনি জানেন, আমরা যে সুন্দরবন যাচ্ছি, সেখানে অনেক কুমীর আছে?
হুমায়ূন : কুমির থাকবে পানিতে, আমরা থাকবো জাহাজে, আমাদের চিন্তা নাই
অমিয় : আচ্ছা, যদি কুমিরের বাচ্চা পাওয়া যায়, আপনি কি করবেন?
হুমায়ূন : বাচ্চা পেলে বাসায় নিয়ে আসবো। কচ্ছপের বাচ্চা আছে বাসায়। কুমিরের বাচ্চা আর কচ্ছপের বাচ্চা গল্প করে সময় কাটাতে পারবে।

দুপুরের ভাত খাওয়ার পর হুমায়ূন আহমেদ খানিক ঘুমান। এটা তার দীর্ঘ দিনের অভ্যাস। জাহাজেও তার ব্যতিক্রম হলো না। বিকেলের দিকে রোদের তেজ কমে এলে ছাদের উপর উঠে আসেন সবাই। খানিক পরে এসে যোগ দেন হুমায়ূন আহমেদ আর শাওন। সঙ্গে তাদের শিশু পুত্র নিষাদ। নিষাদকে দেখে রাখার জন্য মোস্তফা আছে। কিন্তু বাবা-মা কেউই তাকে হাতছাড়া করছেন না। ছেলেটাও অনেক বেশী বাবা ভক্ত। সারাক্ষণ বাবার হাত ধরে থাকে।
বড় মাদুর বিছানো হয়েছে জাহাজের ছাদে। দূরে বাংলাদেশের শেষ সীমানার জনপদের সামান্য চিহ্ন এক পাশে, অপর পাশে শুধুই সমুদ্র। জাহাজের গতির সাথে পাল্লা দিয়ে কতগুলো গাংচিল উড়ে উড়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের।
হুমায়ূন আহমেদ তার নাইকন এন-নাইনটি ক্যামেরাটা নিয়ে সেই পাখীগুলোর ছবি তোলার কাজে ব্যাস্ত হয়ে গেলেন। ছবি তোলাতে তাঁর তেমন দক্ষতা নেই। একবার ইচ্ছা হলো, বলি-যে, স্যার ক্যামেরা ধরার একটা কৌশল আছে। দামী ও বড় ক্যামেরা হাতে নিয়ে ছবি তোলার জন্য কেউ তৈরী হলেই বোঝা যায়, তিনি কতোটা ফটোগ্রাফার। অনেকটা আমার গীটার ধরার মতো। গীটার হাতে নিলেই আমার পুত্র বলে, বাবা ওটা তোমার কাজ না।
ছাদের উপরে গোটা তিরিশেক যাত্রী। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। এদের অর্ধেকের বেশীই ক্যামেরাম্যান। সবার হাতেই কিছু না কিছু, যার ক্যামেরা নাই, তার জন্য মোবাইল তো আছে!
শুরু হলো নানা রকম ফটোসেশন। বিদায়ী সুর্যটা এমন সহজ ভাবে এসে ধরা দেয় না। গাও গেরামে গেলে বিস্তীর্ন হাওড় পাড়ে হয়তো খানিকটা পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সমুদ্রতীরে পাওয়া যায় না, এখানে সমুদ্রের বুকে সূর্য ডোবে, আজ ডুবছে সমুদ্রের বিপরীত দিকে। গাছগাছালির আড়ালে।
কিছুক্ষনের মধ্যে ছাদের উপর ঘুড়ি ওড়ানোর আয়োজন শুরু হয়ে যায়। সুতরাং দূরের ডুবে যাওয়া সূর্য, পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া পাখীর সাথে যোগ হওয়া ঘুড়ি বিষয় হিসেবে নতুন একটা মাত্রা যোগ করে।
এতো প্রাণোচ্ছ্বল ক্যামেরামেনদের দেখে হুমায়ূন আহমেদ এর মধ্যে এক ফটো প্রতিযোগীতার ঘোষনা দিয়ে বসেন। প্রতিযোগিতা সবার জন্য উন্মুক্ত। তিনি নিজেও একজন থাকবেন প্রতিযোগি হিসেবে। সুন্দরবন ট্যুরে তোলা প্রত্যেকের হাজার হাজার ছবি থেকে বাছাই করে ১০টি ছবি জমা নেয়া হবে। যে ক’টা ছবি জমা পড়বে তার মধ্য থেকে ১০টি ছবিকে পুরস্কৃত করা হবে। এ ছবিগুলো বাধাই করে রাখা হবে নুহাশপল্লীর হল ঘরে। তাঁর ওখানে বেড়াতে যাওয়া অতিথিদের এ ছবিগুলো দেখানো হবে।
এই ঘোষনা শোনার কিছুক্ষণ পর একটা ঘুড়ি পানিতে পড়ে আধডোবা হয়ে যাওয়ার সময় আমি একটি ছবি তুলি। ক্যামেরার এলসিডি স্ক্রীনে ছবিটা তাঁকে দেখাই। তিনি একবার আমার দিকে তাকান, একবার ছবির দিকে। আর কারো কোনো ছবি না দেখেই ডিক্লেয়ার করে দেন, এটাই ফার্স্ট। এ ফলাফল মানতে চাইলো না আরো দু’জন বড় প্রতিযোগি। একজন মাযহার, অপরজন মাসুদ আকন্দ। তাদের দাবি, ঢাকা না ফেরা পর্যন্ত প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষনা করা যাবে না। কোমরে গামছা বেধে ছবি তুলতে শুরু করলো তারা।
ছবি তোলাতুলির এ আয়োজনে সবচেয়ে সক্রিয় মাসুদ আকন্দ। সে বহুগুনে গুণান্বীত এক যুবক। সুইডেনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়াশুনা করে এসেছে। মাথার মধ্যে কিলবিল করছে ছবির প্লট। সংকট শুধু প্রডিউসারের। অনেকের সাথেই কথা বলেছে, সবাই খালি হু হা করে। ঝাইড়া কেউ কাশে না। একজন যুৎসই প্রডিউসার পেলে সে দেখিয়ে দিতো ফিল্ম কাকে বলে। বাংলাদেশের ফিল্ম কেনো অস্কারে যাবে না, এ নিয়ে তার খেদের শেষ নাই। আমার মনে হলো নতুন এক অস্কারজয়ী ফিল্ম মেকার সম্ভবতঃ আমরা পেতে যাচ্ছি। আমি অত্যন্ত ধৈয্য নিয়ে তার ফিল্মী কাহিনী গুলো শুনতে থাকি এবং উৎসাহ দিয়ে বলি, চমৎকার আইডিয়া, করে ফেলো। তখনই মাসুদ বলে, প্রডিউসার পাই নাতো, আপনি প্রডিউস করবেন?

মাসুদ আকন্দের সাথে আমার কিছুদিন আগে মাত্র পরিচয়। হুমায়ূন আহমেদের ‘দখিন হাওয়া’র ফ্লাটে। স্যারই তার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেন।
ঘটনাটি ছিলো এমন যে, একবার এক যুবক নুহাশপল্লীর গেটে এসে ভেতরে ঢুকার জন্য ব্যাকুল। এই তরুণ এলো তাঁর সাথে দেখা করতে। তার একটাই চাওয়া, হুমায়ূন আহমেদের সাথে সে কাজ করতে চায়।
হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়, ‘এই আপদ দূর করার জন্য বললাম, ফিল্ম মেকিং এতো সহজ কাজ নয়। তোমার কি এ বিষয়ে পড়াশুনা আছে? ছেলেটি মাথা নাড়ে। বলে, স্যার আপনি বললে আমি একটা কোর্স করে ফেলতে পারি। আমি বিদায় করার জন্য বললাম ঠিক আছে, কোর্স শেষ করে দেখা করো। গত মাসে সে চলে এসেছে, এর মধ্যে সুইডেনের একটা ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে ২ বছরের একটা কোর্সও করেছে। দেখি কী করে গাধাটা।’
স্যার তার প্রিয়ভাজন অনেককেই ‘গাধা’ বলতেন। এটা অনেক সময় কমপ্লিম্যান্ট হিসেবে মনে করতো অনেকে। মাসুদ আকন্দ দিনে রাতে প্রায় ১৮ ঘন্টার মতো সময় কাটায় স্যারের সাথে, স্যারের বাসায়, নুহাশপল্লেিত বা শুটিং স্পটে। কখনো কখনো দখিন হাওয়ায় একটা কামরাও তার জন্য বরাদ্দ থাকে, কখনো বা সে তার ইব্রাহিমপুরের বাসায় গিয়ে ঘুমায়। আবার সকালে এসে হাজির। স্যারকে ডাকে গুরু, শাওনকে গুরুপতিœ। আমি পরামর্শ দেই, দু’জনকে একসাথে ডাকলে তুমি জি-টু-পি ডাকতে পারো, জি+জিপি [গুরু+গুরুপতিœ], জি স্কোয়ার পি বা জিটুপি।
মাসুদ আমার উপর ক্ষেপে যায়। তার গুরু আর গুরুপতিœকে হালকাভাবে ডাকার কোনো সুযোগ নাই। এ ক’দিনে তার সাথে আমার সবচেয়ে বেশী খাতির হয়ে যায়। বয়সে সে আমার কিছু ছোট, দু’জনই বিবাহিত কিন্তু এসেছি স্ত্রী সন্তান ছাড়া। তার বৌ বাচ্চা থাকে সুইডেন, আমারটা ঢাকায়। সে দেশে এসেছে হুমায়ূন আহমেদের কাছে ফিল্ম মেকিং এর দীক্ষা নেবার জন্য। বৌ বাচ্চা নিয়ে এসে গুরুসিদ্ধীতে ব্যাঘাত ঘটবে এমনটা তার ধারণা।
এর আগে, যখন তার সাথে আমার দেখা হয় আমাদেরই আড্ডা মহলের একজন ফিসফিস করে বলেছিল, ও হচ্ছে স্বাধীন খসরু দুই। এর আগে স্বাধীন খসরু যেমন লন্ডন থেকে গাট্টি বোচকা নিয়ে দেশে আসে হুমায়ূন আহমেদের সংস্পর্শে থেকে মিডিয়ায় কাজ করতে, মাসুদ আকন্দও তাই।

সূর্য ডুবে যাওয়ার পর জানুয়ারীর ঠান্ডা হাওয়া জাহাজের ছাদে আমাদের বেশীক্ষণ আটকে রাখতে পারে না। আমরা নীচে নেমে এসে চাদর দিয়ে ঠান্ডা বাতাসের গতি আটকিয়ে বসে পড়ি রাতের আড্ডায়। পানাহারের মধ্যে তখন একমাত্র শাওনের প্রাঞ্জল গানই আমাদের বিনোদন।
হুমায়ূন আহমেদই বারবার অনুরোধ করে গান গাওয়ান শাওনকে দিয়ে। এবং প্রায় প্রতিবারই তিনি তার নিজের লেখা গানগুলোর শানে নযুলের ব্যাখা দেন। বেশীরভাগ গানই শাওন ও তাঁর বিবাহপূর্ব সম্পর্কের বিভিন্ন ঘটনাক্রমে লেখা। তবে শুধু নিজের লেখা গানই না, রবীন্দনাথের পূজাপর্বের কিছু গান শাওনের গলায় চমৎকার খেলে। আমরা মুগ্ধ শ্রোতার মতো বসে বসে মাঝ রাত অবধি গান শুনি।
আমাদের নিখাদ আড্ডা হয়েছে কোখাও এবং শাওন গান গায়নি- সে নুহামপল্লী, দখিন হাওয়া বা ফিলমের লোকেশন, যেখানেই হোক না কেনো এ সঙ্গিতায়জনটি প্রায় অপরিহার্যই। বন্ধু বান্ধব নিয়ে আড্ডায় বসলেই মিষ্টি করে ডাকবেন শাওনকে। বলবেন, ‘কুসুম, সবাই তোমার গান শুনতে চাইছে, তুমি কি উনাদের একটু গেয়ে শোনাবে?’
এসব ক্ষেত্রে শাওন খুব কমই গররাজি হয়। খালি গলায় গায়। বেশীর ভাগই রবীন্দ্র সঙ্গীত, কিছু তাঁর নিজের লেখা। একটি মাত্র নজরুলগীতি শাওনকে দিয়ে বারবার গাইয়েছেন। গানটি হলো-‘পথ হারা পাখি, খুজে ফিরে….’ এবং প্রতিবারই এই গানটির প্রেক্ষাপট তিনি বর্ণনা করেন। কাজী নজরুল ইসলাম কপর্দকহীন অবস্থায় কোলকাতার এক মেসে থাকেন। এমন সময় খবর পেলেন তার শিশুপুত্র খুব অসুস্থ, তাঁকে চিকিৎসা করানোর কোনো সম্বল তার স্ত্রীর কাছে নেই। স্ত্রী পত্র পাঠিয়েছেন, কিছু টাকা পাঠানোর জন্য। তিনি দিশেহারার মতো ছুটছেন। এ সময় এক চায়ের দোকানের দোকানী বললো, কাজীদা, একটা গান ধরো তো! কাজীদা বললেন-দাও, কাগজ কলম দাও। কলম পাওয়া গেলে, কাগজ নাই। অবশেষে সিগারেটের প্যাকেট কেটে তার উল্টো দিকে লিখে তখনই সুর করে গানটি গাইলেন। কুসুম, গানটা ধরোতো।
শাওনের গাওয়া এ গানটি তার এতোই প্রিয় যে ২০০৪ সালে বানানো তাঁর চলচ্চিত্র ‘চন্দ্রকথা’তে এ গানটি ৩ বার বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেছেন তিনি। কখনো খলি গলায়, কখনো যন্ত্রসঙ্গীত সহযোগে।
এই চন্দ্রকথা ছবিটি দেখে এক সময় মনে হয়েছিল এটি কি লেখকেরই কোনো চরিত্র কিনা। পৌঢ় জমিদার তার কন্যার চেয়েও কম বয়সী তরুনীকে বিয়ে করার কারনে তার পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে তার যে জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয় সেটা তার জীবনেও হয়েছিল এ ছবি বানানোর অনেক পরে।
এই ছবিতে চাঁদ, বৃষ্টি, জোৎ¯œা এসবেরও অনেক বেশী ব্যবহার হয়েছিল। চন্দ্রকথার ‘চন্দ্র’ চরিত্রে অভিনয় করেছিল শাওন।
আমাদের সফরের তৃতীয় দিন মূলত: আমরা প্রকৃত সুন্দরবনে এসে পৌছি। ‘হিরন পয়েন্ট’ নামক একটা জায়গায় আমাদের বড় জাহাজ এসে সমুদ্রের উপরই নোঙর করে। এখান থেকে আরো দু’টো ছোট ট্রলার আমাদের সুন্দরবনের আরো কাছাকছি নিয়ে আসে। এ ট্রলারগুলো ছাদ খোলা বড় ইঞ্জিন নৌকা। আমাদের নৌকা ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে ছোট ছোট খালের ভেতর। আমরা নৌকা থেকে বসে বসে হরিন দেখার চেষ্টা করি। ট্রলারের মাঝি জানায়, এখানে সে দু’একবার বাঘকে খাল পাড়ি দিতে দেখেছে। বাঘ আপাতত: দেখার ইচ্ছা কারোই নাই। বন্দুক হাতে কোস্টগার্ডেরা যতোই দাঁড়িয়ে থাকুক, বাঘ দেখবো এমন আশাও আমরা করি না।
এই সফরের সময় হুমায়ুন আহমেদের দুটো মাত্র পোর্টেট আমি তুলেছিলাম। হিরন পয়েন্টে এসে বড় জাহাজ থেকে ছোট ট্রলারে করে আমরা ভেতরে যাবো,এমন সময় হঠাঃ দেখি জেটির গায়ের লাল রং তেকে প্রতিফলিত একটা চমৎকার আলো এসে পড়েছে তাঁর মুখে। আমি চেয়ে দেখি,গালের কাছে হাত দিয়ে এক মনে সুন্দরবনের চিকন চিরল পাতার দিকে তার চোখ। আমার ক্যামেরা যে তাকে তাক করে আছে,খেয়াল নাই।

‘হিরন পয়েন্ট’ এর গেস্ট হাউজে নামা হয়। তিন দিনের মাথায় প্রথম মাটির ছোয়া। এখানে দু’টো কামরা ভাড়া করা হয়েছে। সবাই চেয়েছিল স্যার যদি গোসল টোসল করতে চায়-এটাই একমাত্র সুযোগ। কারন ঐ জাহাজে বাথরুম সংকট ছাড়া আর কোনো অসুবিধা ছিলো ন। স্যার রুমে গেলেন না। বলেন, চলো নৌকা নিয়ে আরেকটু ঘুরি।
আমরা আবার সুন্দরবনের ভেতর ঢুকে পড়ি। নানা রকম কেওড়া গাছ, স্বচ্ছ নীল জল। কিন্তু স্যারকে খুব মুগ্ধ হতে দেখলাম না। সুন্দরবন সম্পর্কে তাঁর মনের মধ্যে যে ধারনা ছিলো, তিনি ‘প্রকৃত’ সুন্দরবন দেখে মনে হলো কিঞ্চিত হতাশ। শুধু স্থানীয় মাঝিকে ডেকে কখনোবা কোন গাছটির কী নাম জানতে চেয়েছেন মাত্র। নৌকার মধ্যে যতক্ষণ বসেছিলেন, প্রায় সারক্ষনই তার হাতে ধরা ছিলো শিশুপুত্র নিষাদ।
এক সময় একটা খালের মুখে এসে আমাদের নৌকা থামে। এখানে একটা মাচা বাধা। মাচা দিয়ে অনেকদূর হেঁটে চলার পথ। এ পথটি মাটি থেকে ফুট চার পাঁচেক উপরে, অনেকটা তকতা দিয়ে গাও গেরামে যেমন ব্রীজ বানানো হয়, সে রকম। এই পথ দিয়ে অনেকটুকু হেঁটে সুন্দরবনের ভেতরে যাওয়া যায়। আমরা প্রায় এক শ’ মিটারের মতো পথ অতিক্রম করি। এমন সময় আমাদের গাইড হঠাৎ করে চিৎকার করে উঠে। থামুন সবাই, আর যাবেন না।
সবাই দাঁড়িয়ে যান। গাইড বলে-বাঘের ঘ্রাণ পাচ্ছি, সামনেই বাঘ আছে।
বাঘ দেখতে সুন্দরবন বেড়াতে আসা সবাই আমরা খুব দ্রুত ইউটার্ন মারি। আবার ফেরত যাওয়া নৌকায়। হুমায়ূন আহমেদ ফিসফিস করে বলেন-এটা ঐ ব্যাটার চালাকী। সে কোনো রিস্কের মধ্যে যেতে চায় না বলেই বাঘের ভয় দেখিয়ে সবাইকে নিয়ে ফেরত যাচ্ছে।

আমরা আবার ফেরত আসি। কটকা অভয়ারণ্যে আবার আমরা নামি, সুন্দরবন দেখি, শ্বাসমূল দেখি, পানি দেখি, সমুদ্র দেখি, ছবি তুলি, গল্পকরি, আমাদের দিন শেষ হয়ে আবার রাত আসে।

তৃতীয় রাতে হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে আমার নাম ধরে স্যার ডাক দিলেন।
ঃএই শাকুর, তাড়াতাড়ি তোমার ক্যামেরা নিয়ে আসো। দেখো ওটা কী?

আমি এসে দেখি শীতের ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যে ডেকের ওপর ভারী একটা জ্যাকেট পরে স্যার একা বসে আছেন, সিগারেট খাচ্ছেন ।
আমি কাছে যেতেই বলেন-দেখো, ওটা দেখো। ছবি তুলতে পারবা?

যে দৃশ্য দেখলাম, আমার কাছে অভূতপূর্ব। সূর্য উঠা, সূর্য অস্ত যাওয়া, দুটোই আমার বহুবার বহুভাবে দেখা আছে। কিছু ছবি আমি এদের তুলেছি। সূর্যাস্তের ছবি তুলে আমি কখনোই আনন্দ পাই না। এ দৃশ্যটা এমনিতেই এতো সুন্দর যে, ক্যামেরার ফ্রেম ছোট করে এসে তাকে কোনো ব্যাঞ্জনাই দেয়া যায় না। সুন্দরী মেয়েদের ছবি তুলে যেমন তাদের তুষ্ট করা যায় না, আমারও মনে হয়েছে প্রকৃতির সুন্দর ছবিও কখনো প্রকৃতির চেয়ে সুন্দর হয় না। আমি এ জন্য সূর্যাস্তের ছবি তুলতে আগ্রহ পাই না। কিন্তু এ যে চন্দ্রেদয়ের ছবি! রুপালী থালার মতো একখন্ড চাঁদ ধীরে ধীরে ভেসে উঠলো দূরের বঙ্গোপসাগরের তলা থেকে এবং ধীরে ধীরে উপরে উঠে তার একটা প্রতিবিম্ব তৈরী করেছে সাগরজলের উপর। শুধু এই বিম্বই নয়, সমুদ্রের মৃদু ঢেউ এর আচঁড় লেগে যে প্যাটার্ন তৈরী করছে চাঁদের আলো, সে এক বিষ্ময়কর মুহুর্তের রুপ।
আমি নানা ভাবে এই মুহূর্তটির ছবি তোলার চেষ্টা করি। খানিক পরে ছবিগুলোতে ল্যাপটপে নিয়ে তাকে দেখাতে হুলো আমাকে। চোখের দেখার সাথে ল্যান্সের দেখায় অনেক তফাৎ হয়। তাপরও এখান থেকে একটা ছবি পছন্দ হলো তাঁর। বলেন, এ ছবিটি ব্লাক এন্ড হোয়াইট করে আমাকে প্রিন্ট করে দিও। নুহাশপল্লীর ঘরে আমি রেখে দেবো।
চাঁদের ছবি তোলার সেশন আমাদের শেষ হয়। এক সময় চাঁদ অনেক উপরে উঠে যায় এবং কিছুক্ষণ আগে তার যে প্রতিবিম্ব সাগরের জলে পড়েছিল সেটাও হারিয়ে যায় জাহাজের তলায়। তারপরও শীতের হিমেল হাওয়ার মধ্যে আমরা দুই জনই কেবল মাত্র জাহাজের ডেকে অনেকক্ষণ বসে থাকি। আমরা কেউই কারো সাথে কথা বলি না। কিংবা আমাদের কোনো কথা বলারই প্রয়োজন হয় না।
আমি জানি, এ সময়ে হুমায়ূন আহমেদের অনেক কথা হয়েছে এই সমুদ্রের জল, আকাশ আর পানিতে ডোবানো চন্দ্রের সাথে। চন্দ্র নিয়ে যে লেখকের এতো গান, এত কথা, সে কী আর এ সময় সত্যিই ভেতরে ভেতরে চুপ ছিলো? কে জানে!

সুন্দরবন সফরের দিন ভাটতে শুরু করেছে। তিনদিন পার হয়ে গেছে। মোবাইল বন্ধ, ঢাকার সাথে যোগাযোগ বন্ধ। আমরা বার ও তারিখ ভুলে য্ইা। শুধু বুঝি, আজ রাতের দিকে ফেরত যাত্রা শুরু হবে ঢাকার দিকে। ঢাকা পৌছাতে ২৮ ঘন্টার মতো লাগবে। এই যা।
সুন্দরবনের শেষ দিনে আমাদের জাহাজ দাঁড়িয়ে থাকে দুবলারচর থেকে প্রায় সিকি কিলোমিটার দূরে, সাগরের উপর। এখান থেকে ছোট ছোট নৌকা করে যেতে হবে দুবলার চরে। দুবলার চরে সন্ধ্যায় অনেক আয়োজন আছে।
আমরা তখনো জাহাজে বসেই থাকি। ইমপিরিয়াল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ব্যস্ত হয়ে নৌকা পাড়ি দিচ্ছে। দূরে দ্বীপটি দেখা যায়। জেলে পাড়া।
এই দুবলার চর আগেও দেখেছি। সেটা আরেক দিকে।
হুমায়ূন আহমেদ কে বলি,
ঃ স্যার আপনি কি জানেন, এই চরের প্রধান বৈশিষ্ট্য কি?
ঃ না
ঃ এটা নারী শূন্য দ্বীপ। প্রায় ৪-৫ শ জেলে এ চরে থাকে, কিন্তু কোনো মহিলা নেই।
ঃ বলো কি?
ঃ জ্বী স্যার। মামুনুর রশীদের লেখা একটা নাটক আছে এ দ্বীপকে নিয়ে। নারীশূন্য এই দ্বীপে হঠাৎ করে এক নারীর আগমন ঘটে। কয়েকজন পুরুষ এবং একজন নারীকে নিয়ে বেশ জটিল কাহিনীর তৈরী হয়। বিটিভিতে ৯৫-৯৬ সালের দিকে এ নাটক হয়েছে, মঞ্চেও হয়েছে। নাম ছিলো ‘আদিম’।
: ইন্টারেস্টিং

আমরা জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। মাইকের বিরক্তিকর ঘোষনা আমাদেরকে খুব ডিসটার্ব করছিল। ইমপিরিয়াল কলেজের কয়েকজন ইয়াং টিচার মাইক পেয়েছেন।

Share This Post

Post Comment