শেখ হাসিনা কতোটা নিরাপদ ?

শেখ হাসিনা কতোটা নিরাপদ ?

Hasinaব্রিকলেন প্রতিবেদক: সম্প্রতি নেদারল্যান্ড সফরে এসে প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে মিলিত হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফিরে সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “বিএনপি-জামাত থেকে যারা আমার দলে আসতে চায়, তাদের আমরা নেব না। আওয়ামী লীগের এমন দুর্দিন আসে নাই জামায়াত বিএনপি থেকে লোক এনে দল চালাতে হবে’’
তবে তাঁর নেদারল্যান্ড সফরকালীন সময়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হওয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার পর ব্রিটেনে আলোচনার জন্ম দেয়। শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় যুবদলের এক নেতাকে। বাংলাদেশে থাকা কালীন সময়ে বিএনপির গুম হয়ে যাওয়া নেতা এম ইলিয়াস আলী সিলেট আসলে ঐ নেতার গাড়িতেই চড়তেন বলে জানা যায়। ওই নেতা যুক্তরাজ্যে আসার পরও বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তবে সম্প্রতি তারা দুই ভাই একসাথে আওয়ামী লীগে সরব হয়েছেন।

এই মানুষটি কবে, কিভাবে আওয়ামী লীগে বা যুবলীগে যোগ দিলেন তা কেউ জানে না । কার হাত ধরে শেখ হাসিনার এতো কাছে যাওয়ার সুযোগ পেলেন এই নিয়ে ও প্রশ্ন তুলছেন অনেক নিবেদিত আওয়ামীলীগকর্মী। দীর্ঘদিন ধরে যারা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত , নানা রকম হামলা মামলার শিকার হয়েছেন, তাঁদের অনেকেরই সৌভাগ্য হয়নি আজ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ লাভ। যুবদলের এই নেতা বছর দুয়েক আগেও ব্রিটেনে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধ্,আওয়ামী লীগের শাসনের বিরুদ্ধ্ রাজপথে মিছিল মিটিং করেছেন। সেই একই ব্যাক্তি রাতারাতি আওয়ামী লীগার হয়ে একদম শেখ হাসিনার পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন!

সরকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়ার সময় নানা ভাবে তাঁদের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাস যাচাই করা হয়। কিন্তু শেখ হাসিনার কাছাকাছি যারা যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন তাঁদের ব্যাক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাস যাচাইয়ের কি কোন ব্যবস্থা আছে? অশুভ চক্র ১৯৭৫ পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তাঁদের মানুষ কে নিয়োগ করেছে। ছোবল দেয়ার সময় এরা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে।

১৯৭৫ সালে স্বপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে হত্যার সময় সৌভাগ্য ক্রমে বিদেশে থাকায় সেদিন বেচে গিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বোন শেখ রেহানা। খুনীরা হয়তো ধরে নিয়েছিল এই দুই কন্যা আর বাংলাদেশে কোনদিন ফিরে যাবে না। খুনীদের সেই ধারণা কে মিথ্যে করে দিয়ে দেশে ফিরেছিলেন শেখ হাসিনা। এর পর একে একে ছোট বড় মিলিয়ে ১৯ বার হত্যার উদ্দ্যেশ্যে তাঁর উপর হামলা হয়েছে। বারবার তিনি নেতা কর্মীর বুকের রক্তে কখনো ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছেন। এই খুনি চক্র আজ ও হাত পা গুটিয়ে বসে নেই।

চলতি বছরের মে মাসে শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের ‘নিরাপত্তা হুমকি’ থাকায় ওই পরিবারের সাত সদস্যের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তায় ১৩টি বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি ছয় ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের বাসভবনের চারপাশে সুউচ্চ ভবনের বাসিন্দাদের ওপর সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি করা হবে। এমনকি আবাসস্থলের আশপাশে কোনো ভবন, স্থাপনা বা অবস্থান থেকে কোনো প্রকার হুমকি সৃষ্টি করার মতো অবস্থা থাকলে ওই স্থাপনা অপসারণ কিংবা পরিবর্তনের মাধ্যমে আবাসস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

২৫ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ প্রজ্ঞাপন সরকারি মুদ্রণালয়ে (বিজি প্রেস) পাঠানো হয় জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন-২০০৯’-এর ৪ (৩) ধারা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এ আদেশ জারি করা হয়েছে। ওই ধারায় পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য নিরাপদ ও সুরক্ষিত আবাসনের ব্যবস্থা ও এই বিবেচনায় প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সরকার তাদের সার্বক্ষণিক নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দেবে। নিরাপত্তার জন্য তাদের বাসভবন, ভবনের আশপাশের ভবনে নজরদারি করবে। আবাসস্থলে কোনো ব্যক্তি বা বস্তু ঢোকানোর আগে পরীক্ষা করা হবে। আবাসস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বের হওয়ার জন্য এক বা একাধিক বিশেষ নির্গমন পথের ব্যবস্থা করা হবে। আবাসস্থলে সার্বক্ষণিক প্রয়োজনীয়সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত রাখা হবে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তাঁদের আবাসস্থলের পাশের কোনো ‘ভবন, স্থাপনা বা অবস্থান’ হতে ‘কোনো প্রকার হুমকি সৃষ্টি করিবার মতো অবস্থা থাকিলে’ তা অপসারণ কিংবা পরিবর্তন করা হবে। আবাসস্থলের চারপাশে সুউচ্চ ভবনে বসবাসকারীদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হবে। এ ছাড়া তাঁদের আবাসস্থলে গমনাগমনের পথ যেকোনো ধরনের আক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা, সার্বক্ষণিকভাবে ফায়ার সার্ভির গাড়ি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার কথাও বলা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন আবাসস্থলের মেরামত, সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেবে সরকার। একজন ড্রাইভার ও প্রয়োজনীয় পেট্রলসহ তাঁদের গাড়ির সুবিধা দেবে সরকার। বাসভবনে সব সময়ের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ চিকিৎসা অ্যাম্বুলেন্স রাখা হবে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। দেশে-বিদেশে সরকারি খরচে তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। তাঁদের গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টারনেটের খরচও দেবে সরকার।

তা ছাড়া তাঁদের জন্য সরকারি খরচে একজন ব্যক্তিগত সহকারী, দুজন বেয়ারা, একজন বাবুর্চি, একজন মালী ও একজন ঝাড়ুদার নিয়োগ করা হবে। প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, এসবের বাইরেও অন্য কোনো প্রকার ‘সহায়তা বা আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম বা দ্রব্যাদির প্রয়োজন’ হলে সরকারের ‘অন্যান্য মন্ত্রণালয়/বিভাগ ও সংস্থা’ তা প্রদান করবে। আইন অনুযায়ী, ‘পরিবার-সদস্য অর্থাৎ জাতির পিতার জীবিত দুই কন্যা এবং তাঁহাদের সন্তানাদি’।

এই আইনের ফলে কি আসলেই নিরাপদে আছেন শেখ হাসিনা বা তাঁর পরিবার? ১৯৭৫ সালে ও খুনীদের সাথে হাত মিলিয়েছিল খন্দকার মোশতাক। মুশতাকের রক্ত আওয়ামী লীগ থেকে মুছে যায় নি। সারা জীবন যারা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করেছে, বঙ্গবন্ধু কে নিয়ে উপহাস করেছে।বঙ্গবন্ধুদের খুনীদের বাহবা দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। নারী নেতৃত্ব হারাম বলে ফতোয়া জারী করেছে। আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে দেশ ভারত হয়ে যাবে, দেশে কোন মসজিদ থাকবে না। আযানের বদলে উলুধ্বনি শোনা যাবে, সেই সব মানুষ দলে দলে জয়বাংলা বলে আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছে। এদিকে বাস্তবিক প্রধানমন্ত্রীর সে সব বক্তব্য তোড়াই কেয়ার করছেন দলের আঞ্চলিক নেতা বা এমপিরা।

গত বছরের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সারাদেশে বিএনপি-জামায়াতের অন্তত ২০ হাজার নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে বলে গণমাধ্যমের খবরে এসেছে। বলা হচ্ছে, কেবল জামায়াত থেকেই আওয়ামী লীগে ভিড়েছে ৫ হাজার জন।

ভিন্ন দল থেকে ভেড়ানোর জন্য নিজের দলের নেতাদেরই দায়ী করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।
“গ্রুপিংয়ে দল ভারী করতে অনেকে নিয়ে নেয়,” বলেছেন শেখ হাসিনা।

দলীয় নেতাদের সতর্ক করে তিনি বলেন, “তারা (যোগদানকারী) আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে অন্তঃদ্বন্দের সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীতে দলের নেতা-কর্মীদের হত্যা করে।“আওয়ামী লীগের লোক মারা গেলেই শুধু কোনো অসুবিধা নেই। তারা ভালো সেজে ঢুকেই হত্যা করে।”

শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের রোকন নওশের আলী স্থানীয় যুবলীগ আয়োজিত এক নির্বাচনী সভায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের হাতে ফুল দিয়ে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেন।

প্রধানমন্ত্রী যখন বলছেন বিএনপি জামায়াত থেকে লোক নিবেন না ঠিক তার পরেরদিন শরীয়তপুরে এক ইউনিয়নে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন ৯৯ জন ।

আরেকটি ১৫ আগস্টের হুমকি ধামকি প্রায়ই শুনতে হয়। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি ও খুব ভালো করেই জানে গণতান্ত্রিক উপায়ে তাঁদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ নেই। মাঠ পর্যায়ের তাঁদের নেতা কর্মীরা ও বিশ্বাস করে, স্বপ্ন দেখে শেখ হাসিনা কে যে কোন সময় হত্যার মধ্য দিয়ে তারা ক্ষমতায় আসবে। তখন সাধারণ মানুষ কে এই দলবদল লোকদের নেত্রীর কাছাকাছি যাওয়ার ক্ষেত্র যারা তৈরী করে দিচ্ছেন তাঁদের কে নিয়ে ও প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। তাঁদের কাছে আসলেই কতোটা নিরাপদ শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার নিরাপত্তার জন্য এতো আয়োজন, আইন প্রণয়ন সবই কাগুজে বাঘ ছাড়া আর কিছুই নয় কি? এমনটাই মনে করেন আওয়ালীগ নেতারা।

বিষয়টি সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগ নেতা প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এমন কিছু হয়ে থাকলে বিষয়টি নি:সন্দেহে উদ্বেগের। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কিছু মহল আওয়ামীলীগের দলীয় শৃঙ্খলা নষ্ট করতে তৎপর রয়েছে। তবে প্রাণপ্রিয় নেত্রীর নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা যেকোন পদক্ষেপ নিতে সদা সচেষ্ঠ। বিষয়টি সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে যুক্তরাজ্য আওয়ামীলগের নেতৃস্থাণীয় বেশ কয়েকজন নেতার সাথে যোগাযোগ করলে কেউই সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানতে চাননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক নেতাই বলেছেন, আওয়ামীলীগকর্মীদের সতর্ক থাকা খুবই জরুরী, ছদ্দ বেশে আবার না নতুন কোন মোশতাক ঢুকে পরে দলে।

Share This Post

Post Comment