যশোর রোডের শতবর্ষী বৃক্ষরাজি রক্ষায় জমি অধিগ্রহনের বিকল্প

সুমন দেবনাথ; লন্ডন। যশোরের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষরাজী নিয়ে এ পর্যন্ত অনেক লেখাই পড়েছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে। ইতিমধ্যেই আমরা জেনেছি, উক্ত রাস্তায়ও চার লেন করতে প্রায় ২৩০০টি শতবর্ষী গাছ কাটা পড়বে এমনই এক মহাপরিকল্পনা নিয়েছেন আমাদের দেশের কতিপয় মাথামোটা পরিকল্পনাবিদরা! উন্নয়নের দোহাই দিয়ে শতবর্ষী এই গাছগুলো কেটে ফেলা হলে তা হবে একটি আত্মধ্বংসী উদ্যোগ।

বর্তমানে বিশ্বায়নের এই যুগে বিশ্বে দেদারছে নগরায়ন হচ্ছে, উন্নায়ন হচ্ছে , যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি নি:সন্দেহে! বর্তমানে বিশ্বের সবদেশেই নগরায়ন হচ্ছে তবে তা “পরিবেশ ফ্রেন্ডলী” অর্থ্যাৎ পরিবেশের কোন ক্ষতি না করেই নগরায়ন করেছে তারা। ঐসব দেশের পরিকল্পনাবিদরা মাথায় ঢুকিয়ে নিয়েছেন যে, পরিবেশ বিপর্যস্ত করে সাসটেইন্যাবল উন্নায়ন হয় না! কারণ পরিবেশ বিপর্যস্ত করা মানেই হলো জীববৈচিত্রের ভারসম্যে আঘাত করা আর সেখানে আঘাত লাগলেই মানবজাতির অস্তিত্ব বিলিন হতে সময়ের ব্যাপার মাত্র! এই সহজ জিনিসটাই কেন আমাদের মাথামোটা পরিকল্পনাবিধরা বুঝতে পারেন না?

হ্যাঁ, অস্বীকার করছিনা যে যশোর রোড চার লেন করার দরকার নেই! অবশ্যই দরকার আছে তাই আমাদের সে ভাবেই গাছগুলো রেখেই পরিবেশ বান্ধব পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। আমি এই গাছগুলো না কেটে রাস্তা চার লেন কেন ৪০ লেন করার দাবি জানাচ্ছি। এটা কি সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব এবং খুব সহজে। এক পাশের গাছগুলোকে মাঝখানে রেখে রাস্তা চওড়া করা যায়। তাহলে দুই পাশের গাছই বেঁচে যাবে। আর রাস্তার মাঝখানে শতবর্ষী গাছগুলো থাকলে সড়কটির যে ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা রূপ তাও অক্ষুন্ন থাকবে।

গত ক’দিন ধরেই অবাক হয়েই লক্ষ্য করলাম, শতবর্ষী গাছগুলো কেটে ফেরার পক্ষে ফেইসবুকে ইতিমধ্যেই একদল উজবুকের আগমন ঘটেছে তারা যুক্তি দিচ্ছে যে, এই গাছগুলো ইতিমধ্যেই নষ্ট পুরানো হয়েগেছে তাই এগুলো এখন নয় আরো ৩০-৪০ বছর আগেই কেটে ফেলা উচিত ছিল! এদের কাছে একটি প্রশ্ন ডিয়ার উজবুকেরা, আপনাদের দাদা-দাদী ইতিমধ্যেই যারা এক্সপায়ার্ড হয়ে গেছেন (আঁই মিন বৃদ্ধ হয়ে বয়সের ভারে নুয়ে পরেছেন) তাদের কেও কি রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন অকেজো হয়ে গেছেন বলে? নাকি এখনও উনারা আপনার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন পরম মমতায়?

তাছাড়াও ফেইসবুকে আরেকদল আছে যারা যুক্তি দেয়, রাস্তার দু’পাশের জমিগুলো অনেক দামি তাই এগুলো অধিগ্রহন করলে গাছ কাটার চেয়ে খরচ পরবে বেশী! তাই দেশের খরচ বাঁচাতে গাছগুলো কাটাই শ্রেয়! এদের দলে আরেক উপ-উজবুকের দল আছে তারা আবার এক চামচ এগিয়ে বলে, রাস্তার পাশে যাদের জমি আছে সরকার যদি তাদের শেষ সম্বলটুকু নিয়ে নেয় তাহলে তারা পথের ফকির হয়ে যাবে সুতরাং জমি অধিগ্রহন নয় গাছগুলোকেই কেটে ফেলে রাস্তা প্রশস্ত করতে হবে! তাহলে তাদের তুলনামূলক কম জমি যাবে রাস্তায়!

এবার আসি মূলকথায়, আপনি বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন কানুন মেনে চলতে বাধ্য সুতরাং উন্নায়নের স্বার্থে দেশের প্রয়োজনে সরকার চাইলেই আপনার জমি অধিগ্রহন করতেই পারে নির্দিষ্ট পরিমান আর্থিক সুবিধাদি দিয়ে! এখন বলতে পারেন, সরকার তাদের জমি নিয়ে গেলে তারা তো নি:স্ব হয়ে যাবে! তাই বলে কি উন্নায়ন থেমে থাকবে? অবশ্যই না এ থেকে পরিত্রানের রাস্তা অবশ্যই খুঁজে পেতে হবে! এবং তা কিভাবে? আমাদের অধিগ্রহনের এমন এক তরিকা বের করতে হবে যেন, “সাপও মরে আর লাঠিও না ভাঙ্গে!” তাইলে ভাবা যেতে পারে অধিগ্রহনের তরিকা কি হতে পারে? ডিয়ার পরিকল্পনাবিদরা, এই মূহুর্তে আমার মাথায় আসছে, রাস্তা প্রশস্তকরণে জমি অধিগ্রহন করতে এককালিন টাকা পরিশোধ না করে জমির মালিকদের সাথে এমন চুক্তি করা হোক যেন তারা রাস্তা থেকে আদায়কৃত টোলের টাকা মাসিক হিসাবে আজীবন পান (সেটা ১০০ বছরও হতে পারে)। তাহলে আমার মনে হয় না কোন জমির মালিক জমি অধিগ্রহন করতে বাঁধা প্রধান করবেন। আর এটা করা গেলে সরকার ও মালিকপক্ষের উভয়েরই লাভ হবে এবং দুপক্ষেরই উয়িন উয়িন সিচুয়েশন থাকবে। মাননীয় পরিকল্পনাবিদগন দেখুন এভাবে এই পরিকল্পনা কাজে লাগানো যায় কি না?

যশোর রোডটি বেনাপোল সিমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রবেশ করেছে হরিদাশপুর ভারতের অংশে। ওরা যদি গাছগুলো বাঁচিয়ে রাস্তা করতে পারে তা হলে আমরা কেন গাছগুলো বাঁচিয়ে রাস্তা করতে পারবো না! আমাদের কিসের জন্য এতো খাইখাই? এই দেশ মা, মাটি ও পরিবেশ কি আমাদের কিছুই না?

দিনশেষ ভুলেগেলে চলবে না, আমরা সবাই প্রকৃতিরই সন্তান এবং আমাদেরকে এই প্রকৃতির কাছেই ফিরে যেতে হবে! যাওয়ার আগে কি একটি বারও ভাবতে পারি না? কি রেখে যাচ্ছি আমাদের পরবর্তি প্রজন্মের জন্যে?
বি: দ্র: ছবিগুলো ফেইসবুক থেকে সংগ্রহ করা।

লেখক: সুমন দেব নাথ, সাংবাদিক ও অনলাইন এক্টিভিষ্ট।
লন্ডন ১৬/০১/১৮25F730C6-9C6F-4542-A392-1DFA92DF0C30 0E9FA36A-5B04-46FE-89B5-C19F7098B1F2

 

Share This Post