সাম্প্রতিক বাস্তবতা ও রোহিঙ্গা জনগোষ্টি।

IMG_5829ইভান: ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বার্মাতে সংঘটিত হয়েছিল এক রাজনৈতিক বিক্ষোভ যাকে সেফরন বিপ্লব নামে অভিহিত করা হয়।
তৎকালীন বার্মিজ সামরিক জান্তা ও জাতীয় সামরিক সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে জ্বালানি তেলের উপর সবধরণের ভর্তুকি সরিয়ে ফেলার পরপরই ডিজেল ও পেট্রলের দাম ৬৬% থেকে ১০০% বৃদ্ধি পেয়েছিলো তদুপরি যাত্রীবাহী বাসের জন্য বরাদ্দকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে ৫০০% বাড়িয়েছিল ওই গোঁয়ার সামরিক সরকার।
এরই ফলশ্রুতিতে বার্মার রাজধানীসহ সারা দেশে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, সাধারণ ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী ও নারী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে প্রবল বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং অহিংস প্রতিরোধের একটি আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল যা নাগরিক প্রতিরোধ আন্দোলন নামেও পরিচিতি পেয়েছিলো।

হাজার-হাজার, লাখ-লাখ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর অংশগ্রহণে চলমান ওই আন্দোলনকে সামরিক জেনারেল মিস্টার থাং শোয়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে দমন করেছিলেন।

উক্ত আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দেয়ার অপরাধে বার্মার বহুল জনপ্রিয় কমেডিয়ান ও কার্টুনিস্ট মিস্টার জার্নাগার, জাপানিজ ফটোসাংবাদিক কেনজি নাগাই, রেভারেন্ড ইউ গাম্বিরা নামের একজন শীর্ষস্থানীয় বার্মিজ বৌদ্ধভিক্ষুকে পশুর মতো পেটাতে পেটাতে গ্রেপ্তার করে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাবন্দি করে রেখেছিলো ওই জালিম বার্মিজ সরকার এমনকি রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধধর্মালম্বী জনগণের সর্বোচ্চ পবিত্র স্থান বৌদ্ধমন্দিরের ভিতর সেনাসদস্যরা বুটজুতাপায়ে ঢুকে বৌদ্ধসন্ন্যাসীসহ লুকিয়ে থাকা বিক্ষোভকারীদের অমানবিকভাবে হত্যা করে মন্দির পর্যন্ত ভাঙচুর করেছিল।
ওই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া প্রায় অর্ধশতাধিক ছাত্রসহ বহু প্রতিবাদকারী নিহত এবং অসংখ্য মানুষ নিঁখোঁজ হয়েছিলেন।

নিপীড়নের বাস্তবতা: খোদ বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনের মতো কেন্দ্রীয় শহরের রাজপথে বিভিন্ন সময়ে সরকারবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী মূলধারার শত শত বার্মিজ নাগরিকদের কুকুরের মতো গুলি করে মারতে সামান্য একটুও কুন্ঠাবোধ করেনি ওই সেনাশাসিত বার্মিজ প্রশাসন।

ঐতিহাসিক বাস্তবতা: বার্মা ১৯৪৮ সালে জাপানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করার মাত্র ১৪ বছরের মাথায় ১৯৬২ সালে সেই দেশের সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে দীর্ঘ পঞ্চাশটি বছর পুরাদেশটাকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলো জাতিসংঘসহ সমগ্র বিশ্বের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে।

১৯৯০ সালের নির্বাচনে অং সান সুচির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এন এল ডি) নির্বাচিত হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও সামরিক জান্তা গায়ের জোরে অং সান সুচিকে গৃহবন্দী করে রাখে সুদীর্ঘ বিশটি বছর।

মাত্র পাঁচ বছর আগে সেখানকার সেই জনপ্রিয় নেত্রী অং সান সূচির রাজনৈতিক দল বিপুল ভোট নির্বাচিত হয়ে আসলেও এখনো পর্যন্ত সেই একরোখা সামরিক প্রেতাত্মারা দেশটাকে অদৃশ্য ক্ষমতাবলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে ।

চলমান বাস্তবতা: কমিনিউস্টবাদী চিকনবুদ্ধির চীন সাম্রাজ্যের অঘোষিত এই বার্মিজ উপনিবেশের বেপরোয়া স্বার্থবাজিকে ধর্মীয় সহিংসতা বলে যারা প্রচার করছেন সেইসব রোহিংগাপ্রেমিক মুমিন ভাইয়েরা জানেইনা যে , চাইনিজ আধিপত্যবাদী স্বার্থ বাপদাদার কোন ধর্মকে পাত্তা দেয়না যারা অবাধ্য বৌদ্ধসন্যাসীদের ব্রাশফায়ার করেও হত্যা করতে পারে ।

স্বাধীনতাকামী বৌদ্ধধর্মালম্বী তিব্বতীদের উপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে সবগুলোকে ঠান্ডা করে দিয়ে তাঁদের প্রবাদপ্রতিম নেতা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বৌদ্ধধর্মগুরু দালাইলামাকে পর্যন্ত দাবড়ানির উপর রেখে আমেরিকায় বসিয়ে রাখতে পারা আগ্রাসী চাইনিজ সমর্থিত দানবগুলো উপজাতি রোহিঙ্গাদের চিরতরে বার্মা থেকে অবশ্যই অবশ্যই উচ্ছেদ করবেই করবে যেমনটা করে দেখিয়েছেন তামিল বিদ্রোহীদের চিরতরে দমনকারী একসময়কার শ্রীলংকান লৌহমানব মাহিন্দা রাজাপাকসে।

স্বাধীনতাপূর্ব সময়কাল থেকেই বার্মিজ জাতীয়তাবাদকে মেনে নিতে না পারা বিচ্ছিন্নতাবাদী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ১৯৮২ সালে প্রণীত জাতীয়তা আইনে বার্মিজ সামরিক সরকার সেদেশের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করেছে এইটা ইতিমধ্যে সকলেরই জানা হয়ে গিয়েছে।

এছাড়াও এই চাইনিজ সমর্থিত একরোখা ফ্যাসিস্ট বার্মিজ জান্তা সরকার ২০০৫ সালে রাজধানী রেঙ্গুন থেকে পিনমান শহরে স্থানান্তর করে নিজেদের ক্ষমতার দম্ভ প্রমাণ করে ছাড়ে।

সেনাচৌকি আর পুলিশফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে রোহিঙ্গাজংগীরা যে আত্মঘাতী কাজটি করেছে তার জন্য এখন পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বহন করতেই হবে কেননা এই পশ্চাদপদ মূর্খ উপজাতিদের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও প্রশ্রয়ে এইসব জঙ্গিবাদ ওই অঞ্চলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক বাস্তবতা: ধর্মীয় অনুভূতির অপরাজনীতি চাইনিজ-বার্মাইয়ারা করেনা।
এরা বুঝে শুধু ব্যবসা-আধিপত্য আর বৈশ্বিক প্রসার।
মধ্যপ্রাচ্যের আরবী মাথামোটা বর্বর ধর্মব্যবসায়ীদের শেখানো তাফালিং দিয়ে অনুভূতির চুলকানি জন্ম দেয়া যায় কিন্তু দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

যে সাম্রাজ্যবাদী রাক্ষস নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির নিজ দেশের নিজধর্মের মানুষের বুকে গুলি চালাতে পারে তাদের কাছে ভিনদেশী কাঙ্গালী ছাগলদের জেহাদী হুমকি মূল্যহীন।

নিজদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে লাথি মেরে হেফাজতী জোশ আনা যতটা সহজ তার চাইতে হাজারগুন কঠিন স্বদেশের প্রতিরক্ষা করা।

প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট জাতিগত সংঘাতকে নিজেদের গায়ে টেনে নিয়ে এদেশকে পুনরায় পাকিস্তান বানাবেন না।

যেখানে এই বাংলাদেশ সকালবিকাল ধর্ষণ-খুন আর হানাহানিতে নিজেরাই নিজেদের মানবতা রক্ষায় ব্যর্থ সেখানে এইসব ধর্মপ্রেমদেখানো মানবতার ভন্ডামি নিরর্থক।
আটকেপড়া বিহারীদের নিয়ে যে যন্ত্রনা বাংলাদেশকে আজীবন বইতে হচ্ছে সেখানে নতুন এই রোহিঙ্গাসঙ্কট বাংলাদেশকে অনেক অনেক সমস্যার মুখোমুখি করবে।

রোহিংগারা ভাল থাকুক নিজ নিজ দেশে ।
জংগীদমনের নামে নির্বিচার গণহত্যা বন্ধে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ সময়ের দাবী।

উদ্বাস্তবিহীন প্রিয় বাংলাদেশ সুখী হউক।

লেখক: অনলাইন এক্টিভিষ্ট ও মানবতাবাদী।

Share This Post